নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত স্থবিরতা কাটিয়ে সাধারণ ছুটির মধ্যেই সীমিত পরিসরে কাজ শুরু করে দিয়েছে দেশের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলো। গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি ছুটছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা। সংগ্রহ করছেন ঋণ চাহিদার তথ্য। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের যেমন নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তেমনি গ্রাহক পর্যায়েও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তারা।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির হিসাব মতে, বর্তমানে দেশে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটির সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৭২৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন প্রায় তিন লাখের বেশি কর্মী। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর সাড়ে তিন কোটি সদস্যকে নিয়ে কাজ করছেন এসব কর্মী। এর বাইরে ছোট-বড় আরো কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাঠকর্মীরা জানান, একজন ফিল্ড অফিসারকে (এফও) কাজ করতে হয় প্রায় ৮০ সদস্য নিয়ে। সপ্তাহে অন্তত একবার করে ওইসব সদস্যের বাড়িতে যেতে হয় তাদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের টাকায় গড়ে তোলা খামার বা কৃষি জমিতেও তাদের পরিদর্শনে যেতে হয়। কিন্তু সীমিত পরিসরে কাজ শুরুর এক সপ্তাহ পেরোলেও এখনো তাদের জন্য কোনো সুরক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা হয়নি।
যদিও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি সীমিত পর্যায়ের কাজ শুরুর ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছে। বলেছে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারের কথাও। কিন্তু কর্মীদের বর্ণনা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। তারা বলছেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে এনজিওগুলো। এসব গ্রাহকের অধিকাংশের মধ্যেই কোনো ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার নেই।
চট্টগ্রামের এক এনজিও কর্মকর্তা জানান, গ্রাহক সঞ্চয় হিসাব ও ঋণ হিসাব সংরক্ষণ করা হয় কাগজের বইয়ে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি থেকে হুট করে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারের নির্দেশনা এলেও তার প্রতিপালন কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। তাছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে এখনো অধিকাংশেরই সেলফোনই নেই। আবার পার্বত্য এলাকার এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) সুবিধাও নেই।
অন্যদিকে রংপুর, খুলনা, বরিশালসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের এনজিও কর্মীরা জানালেন, সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেয়া হলেও তাদের কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়নি। সুরক্ষা উপকরণের ব্যবহার সম্পর্কেও কোনো ধারণা তাদের দেয়া হয়নি। এভাবে গ্রাহকের খুব কাছে গিয়ে কাজ করাটা তাদের জন্যও যেমন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি তা হয়ে উঠেছে গ্রাহকদেরও ঝুঁকির কারণ।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক এনজিও কর্মী বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখন ব্যাপক হারে বেড়ে গেলেও এনজিও কর্মীদের কোনো প্রকার সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়নি। আবার আবাসনের জন্যও কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। এ অবস্থায় সারাদিন সদস্যদের বাড়িতে ঘুরে ঋণের তথ্য সংগ্রহ করে দিন শেষে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। এতে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এরই মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি এনজিওর কর্মীরা কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত এনজিও কর্মীদের বীমা বা কোনো ঝুঁকি ভাতার আওতায়ও আনা হয়নি। এ নিয়ে চরম হতাশা কাজ করছে তাদের মধ্যে।
অন্যদিকে সাধারণ ছুটির এ সময় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের যে সকল কর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছেন, তাদের এখন বীমা বা ঝুঁকিভাতার আওতায় আনার সময় এসেছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি এবং নীতি নির্ধারকদের প্রতি বীমা ও ঝুঁকি ভাতার বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবী জানিয়েছেন মাঠপর্যায়ে কর্মরত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। অথরিটির পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষক পর্যায়ে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বর্তমানে ঋণের চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের জরুরী প্রয়োজনে সঞ্চয় উত্তোলনের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই সীমিত পরিসরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সরকারের বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে সরকারে বিধিনিষেধ মেনে এই কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কর্মীদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।










