কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এক বন্দিকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। সেখানে তার শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। পরে ওই বন্দিকে মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রতিদিনই এমন অসুস্থ বন্দিদের নিয়ে কারাগার থেকে ঢামেকসহ বিভিন্ন হাসপাতালে যান কারারক্ষীরা। আবার চিকিৎসা শেষে কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বন্দিদের। যেসব বন্দিকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন কারারক্ষীরা। এভাবে বন্দি আনা-নেয়া ও হাসপাতালে ডিউটি করতে গিয়ে এরই মধ্যে ১০ কারারক্ষী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মাধ্যমে কারাগারে থাকা লক্ষাধিক বন্দির মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
কারা সূত্রে জানা যায়, কারা অভ্যন্তরে বন্দিদের স্বল্প পরিসরে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো বন্দির গুরুতর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাদের ঢামেক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বিএসএমএমইউ) বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। সঙ্গে দেয়া হয় কারারক্ষীদের। চিকিৎসা শেষে বন্দিদের কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যান কারারক্ষীরা। আর যেসব বন্দির চিকিৎসায় দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়, তাদের ওয়ার্ডে দিয়ে হাসপাতালে থাকা কারারক্ষীদের হেফাজতে বুঝিয়ে দেয়া হয়। চিকিৎসা শেষে ওইসব বন্দিকে কারাগারে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বেও থাকেন কারারক্ষীরা।
কারা কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্দির চিকিৎসা করানো হয় ঢামেক ও বিএসএমএমইউ হাসপাতালে। হাসপাতালগুলোতে বন্দিদের চিকিৎসাকালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য
রয়েছে কারারক্ষীদের পৃথক একটি টিম। এ টিমের সদস্যরা পুরনো কারাগারের ব্যারাকে থাকেন। আর ডিউটি করেন বিভিন্ন হাসপাতালে। কারাগার থেকে অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে এনে ওই কারারক্ষীদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে যান কারারক্ষীরা। চিকিৎসা শেষে হাসপাতালের কারারক্ষীরা বন্দিদের বুঝিয়ে দেন কারারক্ষীদের।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র কারারক্ষী শেখ কামাল হোসেন জানান, গত ৮ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত ১০ জন কারারক্ষী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। তারা সবাই ঢামেক হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতেন। বর্তমানে তারা জিঞ্জিরা ২০ শয্যা হাসপাতাল, মুগদা হাসপাতাল ও মিরপুরে সরকার নির্ধারিত কভিড-১৯ চিকিৎসার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম জানান, ওই কারারক্ষীরা পুরান ঢাকার কারাগারে দায়িত্ব পালন করতেন। তাদের দায়িত্ব ছিল অসুস্থ বন্দিদের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো। কিছুদিন আগে ঢামেক হাসপাতালে প্রথমে এক কারারক্ষী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। তার সংস্পর্শে যারা ছিলেন তারাসহ পুরান ঢাকার কারাগারে থাকা আরো বেশ কয়েকজনের নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) করোনা পরীক্ষা করা হয়। আইইডিসিআরের ফলাফলে তাদের করোনা পজিটিভ এসেছে। করোনা পজিটিভ নিয়ে সেসব কারারক্ষী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে এক কারা কর্মকর্তা জানান, যেসব রক্ষী কারাগার থেকে বন্দিদের হাসপাতালে আনা-নেয়া করছেন, তারাই আবার দিন শেষে কারা অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। বন্দিদের খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে সার্বিক দেখাশোনার কাজেও যুক্ত হচ্ছেন ওইসব বন্দি। তাদের কেউ যদি হাসপাতালগুলো থেকে সংক্রমিত হয়ে আসেন, সেক্ষেত্রে এসব কারারক্ষীর মাধ্যমে বন্দিদেরও সংক্রমিত হওয়া শঙ্কা রয়েছে।
কারারক্ষীদের মাধ্যমে বন্দিদের সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা নিয়ে কথা হয় অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল আবরার হোসেনের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এরই মধ্যে যেসব কারারক্ষী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন, তারা সবাই পুরান ঢাকার কারাগারে থাকতেন। এছাড়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের সব কারাগারে কারারক্ষী ও বন্দিরা সবাই এখন পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন। কারাগারের ভেতরে থাকা কারো শরীরেই এখন পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি।
দেশের কারাগারগুলোয় বিভিন্ন দেশের অপরাধীরা বন্দি হিসেবে রয়েছেন। প্রতিটি কারাগারেই বন্দিদের সুরক্ষায় নিয়োজিত রয়েছেন কারারক্ষীরা। দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন তারা। তবে পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ ছাড়াই কারারক্ষীদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কারা সূত্র জানায়, নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বন্দিদের চিকিৎসার জন্য বাইরে নেয়ার সময় সতর্কতা হিসেবে মাস্ক ব্যবহার করা, বন্দি করোনা আক্রান্ত হলে করণীয় ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে প্রতিদিনই সচেতনতা তৈরিতে আলোচনা করা, কারা কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বন্দিদের নিয়মিত হাত ধোয়া, কারাগারের কর্মীদের সুরক্ষার জন্য হ্যান্ডওয়াশ ও স্যানিটাইজারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারা অধিদপ্তর।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এসব সিদ্ধান্তের অধিকাংশই কেবল ঘোষণার মধ্যেই আটকে রয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে বন্দিদের সুরক্ষায় হাত ধোয়ার জন্য হ্যান্ডওয়াশ সরবরাহের কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে সাবান। আর জেলা পর্যায়ের কারাগারগুলোতে বন্দিদের জন্য এখনো হ্যান্ডওয়াশ বা সাবান পৌঁছেনি। আর স্যানিটাইজার কেবল নতুন বন্দিদের ক্ষেত্রেই দেয়া হচ্ছে। অথচ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিতই সাক্ষাৎ করছেন কারাবন্দিরা।
এদিকে সংকট রয়েছে কারাবন্দিদের চিকিৎসায় নিয়োজিত লোকবলের ক্ষেত্রেও। মাত্র দুজন চিকিৎসক, একজন নার্স ও একজন ফার্মাসিস্ট দিয়ে দেশের সব কারাগারের বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়। অথচ এখনো তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় কোনো উপকরণ সরবরাহ করা হয়নি।
কারা চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসান শুভ বণিক বার্তাকে বলেন, কারাগারগুলোতে দেশী বন্দির পাশাপাশি বিদেশী বন্দিও রয়েছেন। কেউ অসুস্থ হলে আমরা তাদের চিকিৎসার বিষয়টি নিশ্চিত করে থাকি। করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় আমরা ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ চেয়ে আবেদন করেছি, কিন্তু এখনো তা পাইনি। এখন শুধু মাস্ক আর স্যানিটাইজার দিয়েই আমাদের ও কারারক্ষীদের সংক্রমণ ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হচ্ছে।










