প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন, ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না। ব্যাংক এমডিদের ওপর কোনো মহল থেকে চাপ এলে সেটিও যেন তাকে জানানো হয়, সে আহ্বান জানিয়েছেন গভর্নর।
বিএনপি সরকারের দেয়া নির্বাচনী ইশতাহার বাস্তবায়নে কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থানের জন্য দেয়া হবে নীতিসহায়তা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বন্ধ হওয়া কারখানা সচল ও সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন নিশ্চিতেও জোর দিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মো. মোস্তাকুর রহমান গত বৃহস্পতিবার গভর্নর পদে যোগ দেন। সে হিসেবে গতকাল ছিল তার দ্বিতীয় কর্মদিবস। এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বে এ দিন ১৯টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী গভর্নরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালকসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘গভর্নর বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাবেক গভর্নর প্রচুর ভালো কাজ করেছেন। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠনসহ ব্যাংক খাতে যেসব সংস্কার কার্যক্রমের উদ্যোগ সে সময় নেয়া হয়েছিল, সেগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না বলেও নতুন গভর্নর আশ্বস্ত করেছেন। ঋণ বিতরণ বা সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়ে এমডিরা যদি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হন, তবে সরাসরি তাকে জানাতে বলেছেন। এবিবির উত্থাপিত সমস্যাগুলোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলেও জানানো হয়েছে।’
মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো ব্যবসার খরচ কমানোর লক্ষ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া। নতুন গভর্নর এ বিষয়েও আশ্বস্ত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ক্রমে কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার পরিকল্পনা করছে; যার শুরু হবে ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত নীতিমালার অধীনে স্বাধীনভাবে ভাড়া এবং লিজিং চুক্তির অনুমতি দেয়ার মাধ্যমে। রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রণোদনার বকেয়া অর্থ ছাড় করার বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া হবে। গভর্নর বিদেশী প্রতিনিধি এবং ঋণদাতাদের জন্য চলতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগে একটি “বাংলাদেশ ডে” আয়োজনের ধারণা দিয়েছেন।’
নতুন গভর্নরের সঙ্গে এটিই ছিল প্রথম সাক্ষাৎ জানিয়ে এবিবি চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি আমাদের গ্রহণ করেছেন। শুরুতে প্রত্যেকের মতামত শুনেছেন। এরপর তার মূল অগ্রাধিকারের রূপরেখা তুলে ধরেন। খেলাপি ঋণ থেকে সৃষ্ট অকার্যকর সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহারের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। কীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো নতুন উৎপাদন বা সেবাধর্মী উদ্যোগের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা করেন।’
‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগের বিষয়ে গভর্নর কথা বলেছেন বলে জানান মাসরুর আরেফিন। উদাহরণ হিসেবে তিনি অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনিরকে কীভাবে ব্যাংকগুলো বিশ্ববাজারে পৌঁছতে সাহায্য করতে পারে, সেটি তুলে ধরেন।
বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়ে বার্তা দিয়েছেন গভর্নর। কর্মসংস্থান তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকে নীতিসহায়তার কথাও বলেছেন। ব্যাংকগুলোকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসার জন্য বলেছেন। আর শাখা খোলার সময় ভাড়া নির্ধারণে অঞ্চলভিত্তিক একটি রেট ঠিক করে দেয়া হবে। নির্ধারিত ভাড়ার মধ্যে থাকলে ব্যাংকগুলোকে এজন্য আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসতে হবে না। এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক সিএমএসএমই পণ্যে অর্থায়ন সমস্যা দূর করার মাধ্যমে ব্রান্ডিং করতে বলেছেন তিনি।’
এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও বৈঠকে অংশ নেন। বণিক বার্তাকে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গভর্নর হওয়ার পর এটি ছিল এবিবির সঙ্গে প্রথম বৈঠক। সে হিসেবে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে। ঋণের সুদহার কীভাবে কমানো যায়, সেটি নিয়েও কথা হয়েছে। তবে সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে কস্ট অব ফান্ডের বিষয়টিও আমলে নেয়ার প্রসঙ্গ এসেছে বৈঠকে।’










