টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আবেদন করে পশ্চিমবঙ্গের তন্তুবায়ী সমবায় সমিতি। পর্যবেক্ষণের নানা ধাপ পেরিয়ে গত ২ জানুয়ারি এর স্বীকৃতি দেয় ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেড মার্কস বিভাগ। তাতে টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া ও পূর্ববর্ধমানের পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাড়িটির ভৌগোলিক নির্দেশক চিহ্ন হিসেবে বলা হয়েছে, এর নাম ‘বাংলার টাঙ্গাইল শাড়ি’। শান্তিপুর ডিজাইন ও ঢাকাই টাঙ্গাইলের সংমিশ্রণে এক ধরনের সংকর শাড়ি এটি। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভারতেই সেটি তৈরি হয়েছে। তাই উৎপত্তি পশ্চিমবঙ্গ এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে ভারতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আবেদনে। একই সঙ্গে এ রেজিস্ট্রেশনের বৈধতা ২০৩০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকবে বলে স্বীকৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তন্তুবায়ী সমবায় সমিতি তাদের জিআই স্বত্বের আবেদনে দাবি করে, পশ্চিমবঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়ি বোনা হয় জ্যাকর্ড তাঁতে। শাড়িতে ব্যবহার করা হয় স্বর্ণের হরিণ, পাতাবাহার ও ফুলের টবসহ নানা ধরনের নকশা। মূলত জ্যাকর্ডের মাধ্যমে নকশাগুলো তোলা হয়। আর এ শাড়ি বোনার পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বসাক পরিবার, যারা মূলত বাংলাদেশ থেকেই ভারতে গেছেন।
বসাক পরিবার ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরই ভারতে যাওয়া শুরু করেন। জীবিকা নির্বাহও করেন আগের পেশার মাধ্যমেই। কিন্তু তারা যে ধরনের শাড়ি পূর্ব বাংলায় গড়তেন সেটির চাহিদা ভারতে ছিল না। তাই তারা মোটা সুতা দিয়ে কাজ শুরু করেন। তাদের স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্যও আছে, যেকোনো তন্তু দিয়ে তারা এ শাড়ি তৈরি করতে পারেন।
|
আবেদনপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, নদীয়া জেলায় ফুলিয়াকে ঘিরে থাকা তাঁতি গোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের টাঙ্গাইল থেকে যাওয়া তাঁতিরা বর্তমানে ‘বাংলার টাঙ্গাইল শাড়ি’ তৈরি করেন। এ শাড়ির উৎপত্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বর্তমান পূর্ব ব্রাহ্মণপাড়ার ধাত্রিগ্রাম ও সমুদ্রগড় এবং নদীয়ার ফুলিয়া শহরে তৈরি করা হয় এ শাড়ি। পাশাপাশি আরো কিছু স্থানেও তৈরি হয়।
টাঙ্গাইল শাড়ির বিশেষ নকশার বিষয়ে আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ময়ূর, পদ্মফুল, বেলপাতা, শঙ্খ, পাতাবাহার, মন্দির, বটগাছ, পাহাড় ও সূর্য নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়। ১২ হাতের শাড়িটি শুধু সুতির তন্তু দিয়ে বোনা নয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন পরিমাণে সিল্ক, তসর ও সিনথেটিক তন্তুর ব্যবহার রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম জরির ব্যবহারও লক্ষণীয়। শুধু তা-ই নয়, বিশেষ ক্ষেত্রে স্বর্ণ ও রূপার জরিও ব্যবহার করা হয়।
টাঙ্গাইল শাড়িকে ভারত নিজেদের ভৌগোলিক পণ্য দাবি করা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে টাঙ্গাইল শাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, ঐতিহাসিকভাবেই টাঙ্গাইল শাড়ি এটি বাংলাদেশের, বরং এখান থেকে যেসব তাঁতি ভারতে গিয়েছিল তারা সেটি সঙ্গে নিয়েছে। উৎপত্তি কিন্তু টাঙ্গাইলেই।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আজ থেকে ২০০-২৫০ বছর আগে টাঙ্গাইলে তাঁতের শাড়ি বোনা হয়। এ এলাকার জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ হওয়ায় শাড়ি বোনার তন্তুটা নরম থাকে। চাকচিক্য বেশি থাকে। ফলে শাড়ির গড়নটা আলাদা হয়, যা এটিকে করে তোলে অধিকতর আরামদায়ক। একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভারত এ শাড়ি তৈরি করলেও জলবায়ুগত পার্থক্যের কারণে সেটা আমাদের মতো এত আরামদায়ক হবে না। ফলে গুণগতভাবে একটি পার্থক্য রয়েই যাবে।’
টাঙ্গাইল শাড়ি পশ্চিমবঙ্গে উৎপন্ন হয়েছে ঐতিহাসিকভাবেই ভারত সেটি দাবি করতে পারে না—উল্লেখ করে রঘুনাথ বসাক বলেন, ‘আমাদের টাঙ্গাইলের মতো ভারতে তাঁতের শাড়ি তৈরি শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। সে সময় টাঙ্গাইল থেকে অনেক বসাক তাঁতি পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। শুরু করে তাঁতির পেশা। ১৯৭১ সালেও অনেক তাঁতি সেখানে চলে যায় এবং একই পেশায় কাজ শুরু করে। তবে এখনো তারা আমাদের মতো করে আরামদায়ক শাড়ি বুনতে পারে না। সুতরাং টাঙ্গাইল শাড়িকে আমাদের পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করব।’
টাঙ্গাইল শাড়ি একেবারেই বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য বলে দাবি করেন টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক মো. কায়ছারুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এর পেছনে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। আমরা টাঙ্গাইল শাড়ি, চমচম, আনারস, জামুর্কীর সন্দেশ, এগুলোর আবেদন করছি। কিছু ডকুমেন্টেশনও করেছি। তার মধ্যে চমচমটি পেয়েছি। আর বাকি তিনটি প্রক্রিয়াধীন। আসলে এগুলোর ডকুমেন্টেশন বা অরিজিন উল্লেখ করেই করতে হয়। এ শাড়ির সঙ্গে বসাক পরিবারের যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে সেগুলো আইডেনটিফাই করে আমরা ডকুমেন্টেশন রেডি করছি। বসাকদের এখানে ২০০ বছরের পুরনো বসতি, এরা ঢাকা থেকে এসেছিল প্রথমে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভারত যেটা করেছে সেটা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) লিসবন এগ্রিমেন্টের আওতায়। এটা বিভিন্নভাবে মিটিগেট (লঘু) করা যায়। কেউ যদি ভুলবশত এ রকম স্বীকৃতি নিয়ে থাকে, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ডব্লিউআইপিওতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে আপিল করে হলেও পদক্ষেপ নেব, যাতে টাঙ্গাইলের শাড়িটা টাঙ্গাইলের নামেই স্বীকৃত হয়।’
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তর হওয়া তাঁতিরাই টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি করছেন। এদের সহযোগিতায় সাংগঠনিকভাবে আবেদন ও প্রমাণসাপেক্ষে ভারত টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই পেতে সক্ষম হয়ে থাকতে পারে। কারণ পণ্যটি স্থাননির্ভর না, তাঁতিনির্ভর। তাঁতি যেখানে থাকবে সেখানেই ওই শাড়ি তৈরি সম্ভব। এ প্রেক্ষাপট ভারত আগে আবেদন করে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও প্রমাণ সাপেক্ষে জিআই সনদ পেতে সক্ষম হয়েছে। আর বাংলাদেশ থেকে আবেদন করা হলেও সেটা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সমন্বয় ও তথ্যপ্রমাণ দাখিলে ঘাটতি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জিআই দুই ধরনের হয়। একটি ধরনের ক্ষেত্রে জিআই হয় স্থানভিত্তিক। স্থানভিত্তিক জিআই সংশ্লিষ্ট দেশ বা পক্ষ ছাড়া অন্য কোনো পক্ষ কিংবা দেশের পক্ষে দাবি করা সম্ভব হয় না। আরেকটি ধরন হলো জেনেরিক জিআই। এক্ষেত্রে একই ধরনের পণ্য, একই উৎপাদন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া, একই কাঁচামাল এবং একই মান বজায় রেখে তৈরি হয় অন্য স্থানে। যে আগে দাবি করে সে প্রমাণ সাপেক্ষে জিআই সনদ পেতে পারে।’
টাঙ্গাইল শাড়ির সুতা মিহি ও চিকন হয়। সেই সঙ্গে টেকসই হওয়ায় দীর্ঘদিন ব্যবহার নৈমিত্তিক ব্যবহারের উপযোগী থাকে। এ ধরনের শাড়ি তপ্ত আবহাওয়ায়ও আরামদায়ক হয়।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাঙ্গাইলের শাড়ির ঐতিহ্য আমাদের দীর্ঘদিনের। টাঙ্গাইলের শাড়ি বললেই এ এলাকার শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু বোঝায় না। সামগ্রিক বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুধু টাঙ্গাইলের শাড়ি না, সারা দেশের যত পণ্য আছে, প্রত্যেকটি জেলা থেকে পণ্য নির্ধারণ করে জিআই আবেদন আমাদের করা আছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।’










