দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিল্প ও সেবা খাতে গেল এক দশকে ইউনিট ও কর্মসংস্থান দুটিই বেড়েছে। অর্থনৈতিক শুমারি অনুসারে, শহর ও গ্রামে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখেরও বেশি। ২০১৩ সালের শুমারিতে যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার। অর্থাৎ পরের দশ বছরে ইউনিট বেড়েছে ৪৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। একইসঙ্গে বেড়েছে কর্মসংস্থানও। এক দশকে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন এটি। অনুষ্ঠানে তথ্যগুলো তুলে ধরেন অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪ প্রকল্পের উপ প্রকল্প পরিচালক মিজানুর রহমান। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এস এম শাকিল আখতার, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার ও বিবিএসের মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিক। এছাড়া স্বাগত বক্তব্য দেন অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪ প্রকল্পের পরিচালক দিপংকর রায়।
প্রতিবেদন বলছে, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি, যা ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার ২২৭টি। ইউনিটগুলোয় বর্তমানে নিয়োজিত রয়েছেন মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জন। অর্থাৎ এক দশকে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, নারীর অংশগ্রহণ ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ী, কর্মসংস্থানে পুরুষের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৪৬ এবং নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশই ঢাকা বিভাগে অবস্থিত। এরপরই চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে রয়েছে ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ ইউনিট রয়েছে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে সিলেট বিভাগে, মাত্র ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া খুলনায় ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ, রংপুরে ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং বরিশালে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ ইউনিট রয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশই সেবা খাতের অন্তর্ভুক্ত, যার সংখ্যা ১ কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৩টি। বিপরীতে শিল্প খাতের ইউনিটের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, যা মোটের মাত্র ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান মেরামত খাত সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে, যার হার ৪১ দশমিক ৮২ শতাংশ।
শিল্পের আকারভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে, দেশের অর্থনীতিতে মাইক্রো ও কুটির শিল্পের প্রাধান্য রয়েছে। মোট ইউনিটের মধ্যে মাইক্রো শিল্পের সংখ্যা ৬৬ লাখ ৩১ হাজার ৪৮২টি, যা ৫৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কুটির শিল্প রয়েছে ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৯টি, যা ৩৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ক্ষুদ্র শিল্প ৪ দশমিক ২০ শতাংশ, মাঝারি শিল্প দশমিক ৩১ শতাংশ এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
মালিকানার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের হার ৮৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির হার ১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা শহরের তুলনায় বেশি। বর্তমানে পল্লী এলাকায় ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮টি ইউনিট রয়েছে, যেখানে শহর এলাকায় রয়েছে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪টি ইউনিট। ২০১৩ সালের তুলনায় উভয় এলাকাতেই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক শুমারির এ চিত্র দেশের অর্থনীতিতে গত এক দশকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও সেবা খাতনির্ভর কাঠামোর বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।










