আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ায় এতদিন গম-ভুট্টার দাম পাচ্ছিলেন না চাষীরা। এতে এক রকম মুখ ফিরিয়েই নেন। কিন্তু বৈশ্বিক সংকটে দেশে গম-ভুট্টার আমদানি কমছে। এতেই চড়েছে বাজার। ফলে লাভের আশায় গম-ভুট্টা চাষে নেমেছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার অন্তত ২০ শতাংশ জমিতে গম ও ভুট্টার চাষ বেড়েছে। তাই আশা করা যায়, বাড়বে উত্পাদন। এতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, আমদানিতে বাঁচবে বৈদেশিক মুদ্রা। আর এসব আসবে কৃষকের হাত ধরেই।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দুই দশক আগেও এ অঞ্চলে গম-ভুট্টা চাষের জমির পরিমাণ ছিল প্রায় অর্ধেক। কিন্তু উচ্চফলনশীল জাত, চাষের আধুনিক কৌশল এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষক ফিরেছেন গম-ভুট্টা চাষে।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও রাজশাহী অঞ্চল প্রধান ড.  ইলিয়াছ হোসেন জানিয়েছেন এ অঞ্চলে গম-ভুট্টার উত্পাদন বাড়ছে। তিনি বলেন,  উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত এবং আধুনিক কৌশলে ভুট্টা-গম চাষে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সার ও বীজ সহায়তাও দেয়া হচ্ছে চাষীদের। এ কাজে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গী কৃষি দপ্তর। 

বৈশ্বিক সংকট কৃষককে রাস্তা দেখিয়েছে বলে মনে করেন রাজশাহী অঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শামছুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, উত্পাদন ঘাটতি থাকায় প্রতি বছরই প্রচুর পরিমাণে গম ও ভুট্টা আমদানি করতে হয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এবার আমদানি কমেছে। ফলে দেশের বাজারে বেড়েছে দাম। আর ভালো দাম পেয়ে কৃষক এবার গম চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। আমরাও প্রণোদনাসহ কৃষকের পাশে দাঁড়াচ্ছি। এবার রাজশাহী অঞ্চলেই অন্তত ২০ শতাংশ গম ও ভুট্টার চাষ বেড়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আশা করা যায় উত্তরাঞ্চলে গম ও ভুট্টা উত্পাদনে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। 

এবার বরেন্দ্র অঞ্চল তথা রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮৯ হাজার ৬৫১ হেক্টর জমিতে গম এবং ৫০ হাজার ২৯৪ জমিতে ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি জমিতে গম ও ভুট্টা চাষের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। একই সঙ্গে এখনো কিছু এলাকায় ভুট্টা চাষ বাকি রয়েছে। শিগগিরই এসব জমিতে ভুট্টা চাষ শেষ হবে।

আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০২১-২২ মৌসুমে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৯৪ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে গম এবং ৫১ হাজার ৭০৭ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছিল। ওই মৌসুমে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৯ টন গম এবং ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৪৯ টন ভুট্টা ঘরে তুলেছিলেন কৃষক। 

২০০৮-০৯ মৌসুমে এ অঞ্চলে গমের আবাদ ছিল ৭৯ হাজার ৪৫ হেক্টর। তখম গম উত্পাদন হয়েছিল ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৮৮ টন। ২০১৫-১৬ মৌসুম পর্যন্ত প্রতি বছরই এ অঞ্চলে গমের আবাদ বাড়ছিল। ওই বছর ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৫ হেক্টর জমিতে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৫ টন গম উত্পাদন হয়। পরের বছর থেকেই কমতে শুরু করে গম চাষের পরিধি। কিন্তু ওঠানামা করেছে উত্পাদন।

জানা গিয়েছে, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ১ লাখ ৯ হাজার ১৫৬ হেক্টরে ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৮৭ টন গম উত্পাদন হলেও ২০২০-২১ মৌসুমে ৯৫ হাজার ১৮২ হেক্টরে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৬ টন গম উত্পাদন হয়।

অন্যদিকে ২০০৮-০৯ মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে ভুট্টার আবাদ ছিল ২১ হাজার ৯০৬ হেক্টর। তা থেকে ভুট্টা উত্পাদন হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৭ টন। প্রায় ১০ বছরের ব্যবধানে চাষের পরিধি এবং উত্পাদন দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। 

২০১৯-২০ মৌসুমে ৫০ হাজার ৯৮০ হেক্টরে ভুট্টা ফলেছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ১৭ টন। ২০২০-২১ মৌসুমে সর্বোচ্চ ৫৩ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। সে বছর ফলন হয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৩ টন। 

গম-ভুট্টার আবাদে কৃষক যেন আর্থিক সংকটে না পড়েন, সে বিষয়টি দেখছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) এমনটি জানিয়েছেন ব্যাংকের পরিচালক জাহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যেখান থেকে গম-ভুট্টা আমদানি হতো, সেখান থেকে আনা যাচ্ছে না। আবার কিছু আনা গেলেও দাম বাড়তি। ফলে আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা যাচ্ছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে সরকার দেশে গম-ভুট্টা উত্পাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কৃষকের ৩০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে রাকাব। এরই মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণ বিতরণ চলবে। চাহিদা থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও জানান এমডি।

জানা গিয়েছে, রাকাবের ৪ শতাংশ বেয়াতি সুদে ৩০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে রংপুর বিভাগের আট জেলার চাষীরা পাবেন ১৯ কোটি টাকা। রাজশাহী বিভাগের আট জেলার চাষীরা পাবেন ১১ কোটি টাকা। রাকাবের গত ২৭ নভেম্বরের তথ্যানুযায়ী, ১৬ কোটি ৪১ লাখ ২৮ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছেন ২ হাজার ৫২০ জন চাষী। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগের ৭২৩ জন পেয়েছেন ৫ কোটি ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। ১১ কোটি টাকা পেয়েছেন রংপুর বিভাগের ১ হাজার ৭৮৮ জন চাষী। রাকাব আরো জানাচ্ছে, এ বছর শস্য বা ফসল খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৫০৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এছাড়া চলমান কৃষিতে ২০৪ কোটি ৭০ লাখ এবং কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে ৮৯৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। এতে উত্তরের অর্থনীতির গতি বদলে যাচ্ছে।