মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও ছিল না লালমনিরহাট আদিতমারীর দিনমজুর মেহের আলীর। স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছন্নছাড়া জীবন ছিল তার। পুরো পরিবার নিয়ে চলে যান নারায়ণগঞ্জে। তার বড় ছেলে মো. শুকুর আলী নয়নের (২৭) পরিশ্রম আর বুদ্ধিমত্তা ফিরতে থাকে দিন। এরই মধ্যে গ্রামে জমি কিনে বাড়ি করেছেন, মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে ফিরেছেন সেই শান্তির নীড়ে। তবে সংসারের টুকিটাকি আসবাবপত্র কেনা এখনো বাকি, তাই থেকে যান নয়ন। তবে সংসার গোছালেও তাতে ফেরা হলো না তার।

গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জে মসজিদে এসি বিস্ফোরিত হয়ে নিহত লাশের সাড়িতে নয়নও রয়েছেন। আদিতমারী উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের তালুক পলাশী এলাকার বাসিন্দা নয়নের স্বজনরা বলছেন, এবার ফিরলে বিয়ে করে ঘরে বউ তোলার কথা ছিল নয়নের। ফিরলেন ঠিকই, তবে বউ নিয়ে নয়, নিজেই লাশ হয়ে।

গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ১২টায় যখন মোবাইলে নয়নের বিষয়ে কথা হচ্ছিল তার বন্ধু শুভ শামীমের (২৩) সাথে। তিনিও নয়নের সঙ্গেই নারায়ণগঞ্জে থাকেন। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে নয়নকে নিয়ে শেষবারের মতো ফিরছেন গ্রামের বাড়িতে। তখন অ্যাম্বুলেন্স বগুড়া পৌঁছেছে বলে জানান শুভ। ওই গাড়িতে নয়নের মা ও ভগ্নিপতিও আছে। শুভ শামীম বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় আমাদের গার্মেন্টস ছুটি হয়েছে। সে বাসায় ফিরে নামাজ পড়তে এসেছিল। নামাজ পড়ে গিয়ে তারপর আমাদের একসাথে রাতের খাবার খাওয়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ খবর পেলাম বিস্ফোরণ, আগুন লাগছে। গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। আমরা ওই মসজিদের মেসেই থাকি। তাকে খোঁজাখুজি করে না পেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ওর মরদেহ ও মোবাইলটি পাই। এরপর ওর বাড়িতে কথা হয়। ওর ভগ্নিপতি ও মা শনিবার সকাল ৬টায় ঢাকায় পৌঁছালে মরদেহ বুঝে পান। এরপর আমরা ১৫ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্ব্যুলেন্স ভাড়া করে লাশ নিয়ে রওনা দিয়েছি। কিন্তু লাশবাহী গাড়ির টাকাও আমাদের হাতে নেই। যদি পারেন আপনিও একটু সহযোগিতা করবেন।

নয়নের সহকর্মী শুভ শামীম আরো বলেন, ‘অনেক মেধাবী ও পরিপাটি ছিল নয়ন। ও স্যাম্পল সুপারভাইজার পদে কাজ করতো। সব সময় সুন্দর পোশাকে থাকার চেষ্টা করতো।’

হোয়াটসঅ্যাপে নয়নের সম্প্রতি তোলা একটি ছবি পাঠান শামীম। টি-শার্টে লেখা- ‘নেভার গিভ আপ’- মানে কখনও হাল ছাড়বেন না। প্রসঙ্গটি নিজেই তুললেন শামীম। আক্ষেপ করে বললেন, ‘আশাবাদি নয়নের নিজেকেই আজ সংসারের হাল ছেড়ে ওপারে পাড়ি জমাতে হলো। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি সে যেন বেহেস্তবাসী হয়।’

কথা হয় নয়নের গ্রামের বাড়ির প্রতিবেশী যুবক খাদিমুল ইসলামের (৩০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ওদের ভিটেমাটি কিছুই ছিল না। ওরা সবাই নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টে কাজ করতো। কিছুদিন আগে বোনকে বিয়ে দিয়েছে। এলাকায় জমি কিনে সেখানে নতুন বাড়ি করেছে। সেখানে মা-বাবা ও দুই ভাইকে পাঠিয়েছে। কিছুদিন পর নয়নের আসার কথা ছিল।

শেষবার বাড়িতে আসলে কথা প্রসঙ্গে নয়ন জানিয়েছিলো, পরের ফিরে বিয়ে করে এলাকায় থিতু হবে সে। গ্রামেই কিছু একটা করবে। এসব জানিয়ে খাদিমুল বলেন, ‘তার আশা পূরণ হলো না। বাড়ি আসলো ঠকই, কিন্তু লাশ হয়ে। ঘটনাটি মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু নয়নের বাবা মেহের আলীর হাতে কোনো টাকা-পয়সা নেই।’


লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফরের সাথে রাত ১২টায় কথা হলে তিনি নয়নের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতার করার আশ্বাস দিয়ে বলেন, এখন অনেক রাত হয়ে গেছে। রবিবার (আজ) মরদেহ আসার পর আমরা জেলা প্রশাসন ও আদিতমারী উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যথাসাধ্য সহযোগিতার চেষ্টা করবো।