রোকেয়া হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রথম পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ছাত্রী নিবাস। হলটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভবন নির্মাণ হয় ১৯৬৪ সালে। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা খাতে সহায়তার জন্য অনুদান দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ হয়েছিল রোকেয়া হলে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভবন ‘শাপলা’। অবকাঠামোগত বৈচিত্র্যের কারণে ওই সময়ে স্থাপনাটি হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন।
হলটি উদ্বোধনের পর পরই আবাসিক ছাত্রী হিসেবে সেখানে থাকার সুযোগ পান ঢাবি শিক্ষার্থী মাহফুজা খানম। ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মনোনয়ন পেয়ে তিনি ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ভিপি নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নির্মিত এ হল প্রসঙ্গে মাহফুজা খানম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৯৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আমি স্টাফ কোয়ার্টারে উঠি। তখন সেটি “উইমেন্স হল” নামে পরিচিত ছিল। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় আমি মেইন বিল্ডিংয়ে উঠি, যা তখন থেকে রোকেয়া হল নামে পরিচিত হওয়া শুরু হয়। তখন ছাত্রদের জন্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক হল, জগন্নাথ হল, ঢাকা হল ও ইকবাল হল ছিল। কিন্তু সেসব হলের ভবনগুলো ছিল দোতলা বা তিনতলা। অন্যদিকে রোকেয়া হলের ভবন ছিল পাঁচতলাবিশিষ্ট। ছাত্রী হলে এত বড় স্থাপনা আমাদের জন্য ভীষণ আনন্দের ছিল।’
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার ও ঢাবি কর্তৃপক্ষ হলটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ বিষয়ে সহায়তা করতে চেয়েছে। ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানটা রোকেয়া হলকে দেয়া হোক। তখন আবাসন ব্যবস্থার তুলনায় ছাত্রী সংখ্যা বেশি ছিল। ছাত্রীরা তখন মূলত চামেলী হাউজ আর অন্য একটা ভবনে থাকত। এ দুটি ভবনে ছাত্রী সংকুলান হচ্ছিল না। সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে অনুদান এসেছিল তা ঢাবির রোকেয়া হলকে দেয়া হয়।’
বর্তমানে রোকেয়া হলে শাপলা ভবন ছাড়াও চামেলী ভবন, অপরাজিতা ভবন ও ৭ মার্চ ভবন রয়েছে। চারটি ভবনের ৫২০টি কক্ষে মোট আবাসিক ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৭০০। তবে আবাসিক ও অনাবাসিক মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাত হাজার। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের উপনেতা মতিয়া চৌধুরী ও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীও ছিলেন রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী। এছাড়া দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছেন এ হলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
রোকেয়া হলের গোড়াপত্তন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য অধ্যাপক জর্জ হ্যারি ল্যাংলি। ১৯২৬ সালে রমনা এলাকার ১৭ নম্বর বাংলোয় ‘চামেরি হাউজ’ নাম দিয়ে তিনি সেখানে ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করেন। এরপর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সেই ছাত্রী নিবাস রূপ পেয়েছে হলের।
চামেরি হাউজে প্রথম আবাসিক ছাত্রী হিসেবে থাকার সুযোগ পান ঢাবি শিক্ষার্থী ফজিলাতুন্নেসা। তখন মোট আবাসিক ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ছয়। পরবর্তী সময়ে চামেরি হাউজের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয় হুদা হাউজে। প্রাচীন এ জমিদার বাড়িটি ছিল কাঠের কারুকার্যমণ্ডিত। ছাত্রী হোস্টেলটি এরপর অনেকের কাছে ‘হুদা হাউজ’ কিংবা ‘চামেলী হাউজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে রোকেয়া হলের অফিস কক্ষটি যেখানে অবস্থিত আগে সেখানেই ছিল পুরনো ছাত্রী হোস্টেলটি, যা ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে ‘উইমেন্স হল’ নামে নারী শিক্ষার্থীদের হলরূপে স্বীকৃতি পায়। একসময় শিক্ষাবিদ শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামাল হলটির নাম পরিবর্তন করে উপমহাদেশে নারী জাগরণ ও শিক্ষার অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামে নামকরণ করার আহ্বান জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালের ২ নভেম্বর হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রোকেয়া হল’।
হলের প্রথম নিজস্ব ভবন নির্মাণ হয় ১৯৬৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় গড়ে তোলা এ পাঁচতলা ভবন এখন পরিচিত ‘শাপলা ভবন’ নামে। হলটির বর্তমান প্রভোস্ট ড. জিনাত হুদা নিজেও রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অবকাঠামোগত বৈচিত্র্যের কারণে সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নির্মিত শাপলা ভবনটি সবার কাছে খুব আকর্ষণীয় ছিল, যার প্রতিটি জায়গাজুড়ে দেখা যায় আধুনিকতার ছোঁয়া। ভবনের নিচে বিশাল একটি কক্ষ রয়েছে, সেখানেও দেখা যায় আধুনিকতার বহিঃপ্রকাশ। যখন ছাত্রী ছিলাম তখন নিচতলার এ কক্ষেই আমরা সব ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। ভবনের বারান্দার ইটগুলো সাজানো হয়েছে মাঝখানে ফাঁকা রেখে। আর পুরো ভবনের চারদিকজুড়ে ছিল বারান্দা। ফলে খুব সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারত। সে সময়ই এ ভবনে লিফট সংযুক্ত করা হয় আর অ্যাটাচ বাথরুমও তৈরি করা হয়। এখন মনে হতে পারে, এগুলো আর তেমন কী! কিন্তু ষাটের দশকে তা ছিল চমৎকার উন্নয়ন।’










