দেশের শহরাঞ্চলে পাওয়া যায় এমন সব সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দিতে চায় সরকার। সে লক্ষ্যে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। শুরুতেই যেসব দিকে নজর দেয়া হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। দেশে হাওর, চর ও পার্বত্যাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার ২০০ গ্রামে সড়ক যোগাযোগ নেই। আবার সমতলের অধিকাংশ গ্রাম পর্যন্ত সংযোগ সড়ক থাকলেও বেশকিছু ক্ষেত্রে সেতুর অভাবে সরাসরি যোগাযোগ করা যায় না। এসব গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট চালুর কথা ভাবছে সরকার। পাশাপাশি গ্রামীণ গ্রোথ সেন্টার ও হাটবাজার কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান তৈরিরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে সরকারের যে মহাপরিকল্পনা তাতে যুক্ত হয়েছে নানা অনুষঙ্গ। দেশের ৮৭ হাজার ২৩০টি গ্রামকে উন্নত গ্রামে রূপান্তরের কর্মপরিকল্পনাও এ মহাযজ্ঞের অংশ। স্থানীয় সরকার বিভাগের আমার গ্রাম আমার শহর প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত জনআয় বাড়াতে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ।

সম্প্রতি এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউনিয়ন পরিষদকে ক্ষমতায়নের বিষয়ে টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন রিভিউ করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমার গ্রাম আমার শহর শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে গ্রামীণ গ্রোথ সেন্টার ও হাটবাজার, গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কমিউনিটি স্পেস ও বিনোদন ব্যবস্থা, উপজেলা মাস্টার প্ল্যান, উপজেলা পরিষদ-ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গ্রামীণ গৃহায়ন ঘিরে নানা ধরনের উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মপরিধিভুক্ত বিষয়ে ৩০টি গাইডলাইন তৈরি ও ৩৬টি সমীক্ষা করা হবে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছর মেয়াদি প্রকল্পটি এলজিইডি ও ডিপিএইচই যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে।

প্রকল্পটি নিয়ে সংসদীয় কমিটির সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, আমার গ্রাম আমার শহর শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পরিষদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি সমীক্ষা রয়েছে। সেই সমীক্ষাসহ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য সমীক্ষা পরিচালনার জন্য একজন পরামর্শক কাজ করছেন।

বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আমার গ্রাম আমার শহর বাস্তবায়নে ইউনিয়ন পরিষদকে ক্ষমতায়ন করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে গ্রামে অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ ঠেকানো যাবে না। ইউপির কার্যাবলি দেখভালের জন্য উপজেলা ও জেলা পরিষদকে সংযুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, এখন থেকে কৃষি জমিতে আর কোনো ঘরবাড়ি নির্মাণ করার অনুমতি দেয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শহরের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটির ২৮ কোটি টাকা ব্যয় বিভাজনের ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পে একজন বিদেশীসহ ১২ জন ব্যক্তি পরামর্শক হিসেবে থাকবেন। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। আটটি প্যাকেজে সমীক্ষা ব্যয় ১৭ কোটি টাকা, বেতন ভাতা, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে প্রশাসনিক ব্যয় ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, স্থানীয় প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ, সেমিনার, আপ্যায়ন, সম্মানী ভাতা হিসেবে ধরা হয়েছে ৮৫ লাখ টাকা। অফিস ভাড়া, আসবাবপত্র, এসি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া, ফটোকপি মেশিন ইত্যাদির জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা, মোটরযান, অন্যান্য সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ ২৩ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও বাঁধাই, বিজ্ঞাপন, প্রকাশনা, অডিও-ভিডিও তৈরিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। দুটি গাড়ি ভাড়ায় ব্যয় রাখা হয়েছে ৪০ লাখ টাকা। ম্যাপ, ডাটাবেজ, বই-পুস্তকসংক্রান্ত ব্যয় রাখা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা, অন্যান্য স্টেশনারি, পোস্টেজ, বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, প্রাইস কন্টিনজেন্সি হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা।

এছাড়া কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় গৃহীত সমীক্ষা ও গাইডলাইনের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, গ্রামীণ যোগাযোগে সড়ক ও সেতু বিষয়ে সাতটি গাইডলাইন তৈরি করা হবে। এজন্য ছয়টি সমীক্ষা করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। গ্রামীণ গ্রোথ সেন্টার ও হাটবাজারের ওপর তিনটি গাইডলাইন তৈরি করা হবে। এজন্য নয়টি সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন বিষয়ে দুটি গাইডলাইন তৈরি করা হবে। এজন্য আটটি সমীক্ষা করা হবে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এসব অঞ্চলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গাইডলাইন তৈরি করা হবে। সেজন্য চারটি সমীক্ষা করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি টাকা। কমিউনিটি স্পেস ও বিনোদন ব্যবস্থার জন্য তিনটি গাইডলাইন তৈরি করা হবে। এজন্য চারটি সমীক্ষা করতে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। উপজেলা উন্নয়ন পরিকল্পনায় ছয়টি গাইডলাইন তৈরিতে চারটি সমীক্ষার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি টাকা। গ্রামীণ গৃহায়ন বিষয়ে দুটি গাইডলাইনের জন্য একটি সমীক্ষা করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ লাখ টাকা। কেবল সমীক্ষা খাতে এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ কোটি টাকা।

প্রকল্পের অগ্রগতি: এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের আওতায় ১১ জন ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে। আটটি প্যাকেজে ৩৬টি সমীক্ষা করতে ছয়টি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে। সমীক্ষাগুলো চলমান। বাকি প্যাকেজের আওতায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য মূল্যায়নের কাজ চলছে। আটটি বিভাগে আটটি এবং বিশেষ অঞ্চলে সাতটি পাইলট গ্রাম নির্বাচনের মানদণ্ড নির্ধারণ, তথ্য সংগ্রহ, গ্রাম পরিদর্শন করা হচ্ছে। লকডাউন পরিস্থিতিতে পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহে বিঘ্ন হওয়ার কারণে এগুলো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিগগিরই পাইলট গ্রাম চূড়ান্তসহ ডিপিপি তৈরির কাজ শেষ হবে। এছাড়া উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের দক্ষতা বৃদ্ধিবিষয়ক সমীক্ষার কাজের খসড়া তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় এরই মধ্যে প্রতিটি গ্রাম নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার উপযোগী করে একটি গ্রাম ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এতে দেশের সব গ্রামের নাম, জনসংখ্যা, আয়তন, অবস্থান ইত্যাদি তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ইত্যাদির তথ্য নেয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এলজিইডি যোগাযোগ সম্পর্কিত তথ্য দিয়েছে। একইভাবে অন্য সংস্থাগুলো তাদের কাছে থাকা তথ্য দেবে। গ্রাম ডাটাবেজে তথ্য সংযোজনের জন্য দেশের সব উপজেলা থেকে সড়ক সংযোগবিহীন গ্রামের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সংস্থার তথ্যও সংগ্রহ করা হবে। প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে একটি ইউনিয়ন ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এ ডাটাবেজ প্রকল্পের সমীক্ষার বিভিন্ন কাজ ছাড়াও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যাবে। এসব তথ্যের মাধ্যমে দেশের যেসব ইউনিয়নের জনসংখ্যা কম, সেখানে তুলনামূলক কম কর্মচারী প্রয়োজন হবে। আবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশি জনঘনত্বের ইউনিয়নগুলো অগ্রাধিকার পাবে।