দেশে মেটার প্লাটফর্মে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী রয়েছে উল্লেখ করে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের সেবা সম্প্রসারণে মেটাকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)।

গতকাল মেটার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারীর (অব.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে। এ সময় কমিশনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এসব আশ্বাস দেয় এ টেক জায়ান্ট। এতে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের লেটেন্সি কমে সেবার গতি ও মান বাড়বে বলে মনে করছেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীরা কম খরচে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

সাক্ষাৎকালে মেটার দক্ষিণ ও সেন্ট্রাল এশিয়ার পাবলিক পলিসি বিষয়ক পরিচালক ইউয়েন টিং চ্যায়, বাংলাদেশ ও নেপালের পাবলিক পলিসি প্রধান রুজান সারওয়ার এবং মেটার এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের লিড এজ স্ট্র্যাটেজি ম্যাট জানসেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

মেটা প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশের পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের কয়েকটি বিধান স্থানীয়ভাবে কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক অথবা এজ নোড স্থাপনে দাপ্তরিক ও আইনগত সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছিল। নতুন সরকারের অনুমোদিত নতুন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী প্রতিবন্ধকতা না থাকায় স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে আরো উদ্যমী ও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করার আশা দেখিয়েছে মেটা।

স্থানীয় সিডিএন স্থাপিত হলে দেশে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের গতি বাড়ার পাশাপাশি খরচ কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনগত জটিলতার কারণে টেক জায়ান্টরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখায় না। আইনগত সহায়তা দিয়ে বিনিয়োগ আনতে পারলে ব্যবহারকারীরা উপকারভোগী হবে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) একেএম ফাহিম মাশরুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় অবকাঠামো স্থাপিত হলে ইন্টারনেটের গতি আগের তুলনায় বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক সংযোগের বড় অংশ সিঙ্গাপুর হয়ে আসে। এতে সময় ও খরচ দুটোই হয়। বাংলাদেশে অবকাঠামো স্থাপন করা গেলে একদিকে খরচ কমবে, অন্যদিকে ডাউনলোড ও আপলোডের গতি বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথের জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হয়। স্থানীয় অবকাঠামো হলে এ খরচ কমার পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা কম দামে ইন্টারনেট বা ফেসবুক ব্যবহার করতে পারবেন।’

মেটা বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার বা সিডিএন স্থাপনে আগ্রহী হলেও কনটেন্টের আইনি দায়বদ্ধতা নিয়ে এখনো জটিলতা রয়েছে। বাংলাদেশে কোনো প্লাটফর্মে কনটেন্ট থাকলে এর দায় প্লাটফর্মের ওপর বর্তায়—এমন আইনি অবস্থানের কারণে ফেসবুক বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অবকাঠামো স্থাপনে আগ্রহী নয়। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কনটেন্টের দায় পোস্টদাতার নাকি প্লাটফর্মের—তা আইনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অন্যান্য দেশে যেভাবে কনটেন্টের দায় পোস্টদাতার ওপর দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশেও সেভাবে আইন সংশোধন করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে নিরাপদ বোধ করবে। বর্তমানে বিনিয়োগের পর কোনো কনটেন্টের জন্য প্লাটফর্মকে দায়ী করা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করছে না।

দেশের মোট জনসংখ্যার ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ ফেসবুক এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন। নেপোলিয়নক্যাট এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৭১ হাজার। ব্যবহারকারীদের ৬২ দশমিক ৩ শতাংশই পুরুষ। বয়সভিত্তিক হিসেবে ১৮-২৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী গোষ্ঠী, এ শ্রেণীতে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ৯৭ লাখ। এছাড়া জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১২ লাখ ৮৭ হাজার। ব্যবহারকারীদের ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ। বয়সভিত্তিক হিসেবে ১৮-২৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী গোষ্ঠী, এ শ্রেণীতে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬২ লাখ।

বিটিআরসি মিডিয়া উইং সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে মেটার ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্থানীয় অফিস স্থাপনের জন্য আহ্বান জানানো হয়। বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর কথা বিবেচনায় নিয়ে দেশে সিডিএন/এজ নোড স্থাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও স্থানীয় পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি মেটার প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়। অপরাধীরা যাতে প্রতারণামূলক কার্যক্রম, বেটিং বা জুয়ার প্রচারণা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও অপসারণের কার্যকর কারিগরি ব্যবস্থা প্রবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ব্যবহারকারীদের জন্য সেবার গুণগত মান এবং দ্রুততর ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজব প্রতিরোধে মেটার কার্যকর সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান। জবাবে মেটার প্রতিনিধি জানান, বিশ্বব্যাপী কর্মী সংখ্যা পুনর্গঠন ও জনবল কমানোর কারণে তাদের কিছু কার্যক্রমে সাময়িক ধীরগতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তারা আশ্বস্ত করেন। সাক্ষাৎকালে মেটার প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ এবং বিটিআরসির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ বিষয়ে উভয়পক্ষ ঐকমত্য পোষণ করেন।

মেটার পাবলিক পলিসির প্রধান রুজান সারওয়ার বিটিআরসি চেয়ারম্যানের মতামতকে স্বাগত জানান। এ সময় তিনি বিটিআরসির সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে অবকাঠামো ও অফিস স্থাপনের বিষয়ে কারিগরি ও আইনগত দিক পর্যালোচনা করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

সাক্ষাৎকালে বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক, সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ এবং সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের উপপরিচালক এসএম তাইফুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।