খরা মৌসুমে দিনাজপুর সদর ও বিরল উপজেলার ৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির সেচ সমস্যা সমাধানের পথে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সদর উপজেলার গৌরীপুরে পুনর্ভবা নদীতে নির্মিত হয়েছে পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামে তথা স্লুইস গেট। ৬২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। নির্মাণকাজ শেষ হয়ে এখন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায়। যদিও স্লুইস গেট অবকাঠামোর ওপর নির্মিত সেতুটি এলাকাবাসীর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলার আস্করপুর ইউনিয়নের গৌরীপুর এলাকার নজরুল ইসলাম জানান, বোরো মৌসুমে এলাকার পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যেত। ফলে অনাবাদি থাকত শত শত একর জমি। ১৫-২০ ফুট গর্ত করে শ্যালো মেশিন বসিয়ে ৭০-৮০ ফুট গভীর থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি তুলে ক্ষেতে দিতে হতো। তার পরও পানি পাওয়া যেত অনেক কম। এখন নদীতে সবসময় পানি থাকায় সেচ দিতে কষ্ট হয় না। এখন আর ভূগর্ভস্থ পানির জন্য কষ্ট করতে হবে না।
সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের উলিপুর গ্রামের আসাদুজ্জামান জানান, নদী পাড়ে চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন তিনি। গৌরীপুরে স্লুইস গেট নির্মাণ হওয়ায় পানির স্তর উপরে উঠে এসেছে। ফলে আলুক্ষেতে সেচ দিতে বেগ পেতে হয়নি। এখন সেই জমিতে বোরো ধান রোপণ করার প্রস্তুতি চলছে। স্লুইস গেট হওয়ার আগে বোরো মৌসুমে কষ্ট করে শুধু আলুই চাষ করতেন তিনি।
এদিকে গৌরীপুর স্লুইস গেট অবকাঠামোর ওপর নির্মিত সেতু উন্মুক্ত করে দেয়ায় বিরল উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ আরো সহজ হয়েছে। এ ইউনিয়নের রাণীপুর, বনগাঁও, কামদেবপুর, প্রাণপুর ও শাহাপুর গ্রামে ৩০ হাজারেরও অধিক মানুষের বাস। অধিকাংশই পেশায় কৃষক। গৌরীপুর-কামদেবপুর এলাকার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় নদীর উভয় পাড়ে বসবাসকারীদের প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়তে হতো। প্রতিদিন অফিস-আদালতসহ দৈনন্দিন কাজে জেলা সদরে আসতে হতো হাজার হাজার মানুষকে।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রাণীপুর এলাকার মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘ব্রিজটা পার হইলেই দিনাজপুর সদর, আর হামাক ১৭ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরি আসিবা লাগোছোলো। আগে রাইতত মানুষের অসুখ হইলে হাসপাতল যাওয়া খুব কষ্টের ব্যাপার আছিল। এই সুইচ গেট হইয়া মানুষের অনেক সুবিধা হইছে। এখন মানুষের অসুখ হইলে তাড়াতাড়ি হাসপাতাল যাবা পারেছে।’
স্থানীয়রা জানায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এলাকার কৃষকরা অনেক সময় উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারেননি। অনেকের নষ্ট হয়েছে কর্মঘণ্টা। অবশেষে সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আর কষ্টের অবসান হতে চলেছে দুই উপজেলার হাজারো মানুষের। আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন স্বপ্ন দেখছে দিনাজপুর সদর ও বিরল উপজেলাবাসী।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, এ প্রকল্পে থাকছে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী চারটি ভেন্ট। প্রতিটি ভেন্ট ছয় মিটার প্রশস্ত। উচ্চতা ৬ দশমিক ৫ মিটার। রয়েছে ৯২ মিটার উইয়্যার (অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়ার ব্যবস্থা)। নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ১২১ মিটার, প্রস্ত ৫ দশমিক ৩ মিটার। আর উভয় পাশে সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়েছে আরো ৫০০ মিটার। মূলত পানির অভাবে অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় আনা, পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি করে সেচ ও সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, নদী ও শাখা খালে দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ বাড়ানো সর্বোপরি সেতুটি নির্মাণ করে দুই উপজেলার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোই ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, গৌরীপুর স্লুইস গেটটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। ফলে স্লুইস গেটের মূল স্থাপনা থেকে ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত পুনর্ভবা নদীতে পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে। উপজেলার প্রায় ৩ হাজার ৬০০ হেক্টর অনাবাদি জমি আসবে চাষের আওতায়। শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থানীয়দের সুপেয় পানির প্রাপ্যতাসহ মৎস্য চাষের অভয়ারণ্য সৃষ্টি হবে। এছাড়া সেতুটি নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। তবে এ সেতু দিয়ে কোনো ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল করার অনুমতি থাকবে না।










