দীর্ঘদিন ধরেই চালক সংকটে রয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবে সম্প্রতি কয়েকটি দুর্ঘটনার কারণে বিষয়টি সামনে আসে। তখনই জানা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও ভারী যান চালানোর মতো চালক পাচ্ছে না ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি কপোরেশন (ডিএনসিসি)। মূলত সরকারি চাকরির জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা ও ভারী যান চালানোর লাইসেন্স পেতে প্রয়োজনীয় বয়সসীমার মধ্যে সমন্বয় না হওয়াই এ সংকটের কারণ বলে মনে করছেন দুই সিটির পরিবহন শাখার কর্মকর্তারা।
এ মুহূর্তে দুই সিটি করপোরেশনে ভারী যান রয়েছে ৩৩০টি। এগুলো চালানোর জন্য বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালক রয়েছেন ২০৬ জন। এর মধ্যে ডিএসসিসিতে ভারী যানের সংখ্যা ১৮৩, চালক রয়েছেন ৮৮ জন। এ হিসেবে ডিএসসিসির চালক প্রয়োজন আরো ৯৫ জন। অন্যদিকে ডিএনসিসির ১৪৭টি ভারী যানের বিপরীতে চালক রয়েছেন ৩৯ জন। অর্থাৎ সেখানে ১০৮ জন নতুন চালক প্রয়োজন।
জানা গেছে, চালক ঘাটতি মেটাতে গত বছর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে ১০৭ জন চালক নিয়োগের অনুমতি চেয়ে চিঠি দেয় ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। জবাবে ৫০ জন চালক নিয়োগের অনুমতি পাওয়া যায়। গত ২৯ জানুয়ারি ৫০ জন চালক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত কেবল ১৯ জনকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়েছে।
সম্প্রতি বর্জ্যবাহী গাড়ির চাপায় দুই সিটিতে দুজনের মৃত্যুর পর সিটি করপোরেশন অধিক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন গাড়ি না চালানোর নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন-১ শাখা। উপসচিব মো. সামছুল ইসলামের স্বাক্ষর করা চিঠিতে বলা হয়, ফিটনেসবিহীন ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি না চালানোর পাশাপাশি বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী ও করপোরেশনের নিজস্ব চালক ছাড়া অন্য কাউকে যেন সিটি করপোরেশনের গাড়ি চালাতে না দেয়া হয়। এ নির্দেশনার পর ৮ ডিসেম্বর ডিএসসিসি নতুন করে ৩২ জন চালক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। পাশাপাশি ডিএনসিসিও ৪৭ জন চালকের চাহিদা জানিয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়ার পরিকল্পনা করে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
দুই সিটির পরিবহন শাখার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পরও ভারী যানচালকের পদে প্রয়োজনীয়সংখ্যক আবেদনই জমা পড়ছে না। ডিএসসিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে ৫০ জন ভারী যানচালকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সেখানে বৈধ লাইসেন্সধারী মাত্র ১৯ জন চালক আবেদন করেন। আবেদনকারী সংকট থাকায় যারাই আবেদন করেছেন, তাদেরই নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, বয়সসীমার কারণে ভারী যানচালক পাওয়া আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। যতজন পাব, তাদের নিয়ে নেব; আর বাকিদের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ও পরীক্ষার পর চালককে প্রথমে হালকা মোটরযানের (ওজন ২৫০০ কেজির নিচে) পেশাদার লাইসেন্স দেয়া হয়। তিন বছর হালকা মোটরযান চালানোর পর একজন চালক মধ্যম শ্রেণীর মোটরযান (২৫০০ থেকে ৬৫০০ কেজি) চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য হন। একইভাবে এরপর তিন বছর হালকা মোটরযান চালানোর পরই তাকে ভারী মোটরযানের (৬৫০০ কেজির ওপরে) জন্য পেশাদার লাইসেন্স দেয়া হয়।
পেশাদার চালক হিসেবে লাইসেন্স পেতে হলে ২১ বছর বয়সে আবেদন করতে হয়। এ হিসেবে একজন পেশাদার চালক হালকা যানের লাইসেন্সের আবেদন করার পর ভারী যানের লাইসেন্স পেতে তার বয়স অন্তত ২৭ বছর হয়ে যায়। অন্যদিকে সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনের বয়সসীমা ৩০ বছর। সিটি করপোরেশনের পরিবহন শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু আমাদের দেশের পেশাদার চালকরা বয়স সম্পর্কে সচেতন নন, তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভারী যানের লাইসেন্স পেতে ৩০ বছর পেরিয়ে যায়। ফলে তখন আর তারা চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন না।
এমন পরিস্থিতিতে ভারী মোটরযানের লাইসেন্স পাওয়ার সময়সীমা সাময়িক সময়ের জন্য বা করপোরেশনের নিয়োগকৃত চালকদের জন্য শিথিলের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ নিয়োগপ্রাপ্ত হালকা মোটরযানের লাইসেন্সধারী চালকদের তিন বছরের কম অভিজ্ঞতা নিয়েই ভারী মোটরযানের লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে সিটি করপোরেশনগুলোর সমস্যা মিটবে বলে মনে করছেন দুই সিটির পরিবহন শাখার কর্মকর্তারা।
ভারী যানের চালক নিয়ে কেবল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনই সংকটে পড়েছে বিষয়টি এমন নয়। বরং সারা দেশেই মাঝারি ও ভারী মোটরযান চালকের সংকট রয়েছে। বিআরটিএর হিসাব বলছে, সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরযান প্রায় ৪০ লাখ। এর বিপরীতে বিআরটিএ অনুমোদিত চালকের সংখ্যা মাত্র ২০ লাখ। দেশে মধ্যম ও ভারী দুই শ্রেণীর মোটরযান চালক সংকটের কথা জানিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বিআরটিএর কর্মকর্তারা।
বিষয়টি নিয়ে ভাবছে খোদ বিআরটিএও। জানা গেছে, সংকট কাটাতে সাময়িকভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্তির শর্তে শিথিল করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র জমা দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির একজন পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেয়া হলে সাময়িকভাবে তিন বছরের বদলে মাত্র এক বছরের অভিজ্ঞতা দিয়েই মধ্যম শ্রেণীর মোটরযানের লাইসেন্স পাওয়া যাবে। একইভাবে তিন বছরের পরিবর্তে এক বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই মধ্যম শ্রেণীর মোটরযান চালকরা পাবেন ভারী মোটরযান চালানোর লাইসেন্স। তবে এ সুযোগ দেয়া হবে কেবল যেসব ক্ষেত্রে সংকট রয়েছে সেসব সংস্থার জন্য।










