গ্রামের চারপাশে, রাস্তার ধারে সংরক্ষিত বন। সেই বন পাহারা দেন স্থানীয়রাই। গাছপালা ও বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধে একাট্টা সবাই। তাদেরই একজন নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার আমন্ত চকমনোহর এলাকার বাসিন্দা মঙ্গল তিরকী। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক মঙ্গল পেশায় কৃষিশ্রমিক। অন্যের জমিতে পরম্পরায় দিনমজুরি করে আসছেন। পাশাপাশি দেখাশোনা করেন সামাজিক বনায়ন, যা কিনা বদলে দিয়েছে তার ভাগ্য। বনের লভ্যাংশ বাবদ সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন ৯ লাখ টাকা।

মঙ্গল তিরকী জানান, বাগান দেখাশোনা করে পাওয়া টাকার ৮ লাখ দিয়ে তিনি দুই বিঘা জমি কিনেছেন। বাকি টাকা খরচ করেছেন মেয়ে সুমিত্রা তিরকীর চিকিৎসায়। ছোটবেলা থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন সুমিত্রা। আরেক মেয়ে রাণী বালা তিরকী সাপাহার সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। একই কলেজে একাদশ শ্রনীতে পড়ে মঙ্গলের একমাত্র ছেলে সুধির তিরকীও। নিজের জমি চাষ করেই এখন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা এবং সংসার চালান এক সময়ের এ হতদরিদ্র।   

বৃহত্তর রাজশাহীতে দুই দশকে ৪৭ কোটি ৫১ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৪ টাকা এসেছে সামাজিক বনায়ন থেকে। এর মধ্যে ৫ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার ৩৬৯ টাকা পেয়েছেন ১৩ হাজার ৬৫১ উপকারভোগী। বন দেখাশোনা করে পাওয়া বিপুল এ অর্থ ভাগ্য বদলে দিয়েছে এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামীণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতেই সামাজিক বনায়ন শুরু হয়। দীর্ঘ এ বনায়ন কার্যক্রমে একদিকে যেমন বনজসম্পদ বেড়েছে, মরুময়তা থেকে রক্ষা পেয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রকৃতি, তেমনি আর্থিক ভিত শক্তিশালী হয়েছে উপকারভোগীদের।  

বন বিভাগ বলছে, ২০০৮-২২ সাল পর্যন্ত এমন ২১ উপকারভোগী প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে লভ্যাংশের চেক পেছেন। ২০১৫ সালে পেয়েছেন দুজন। ২০১৬, ২০১৭, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে এ অঞ্চলের কেউ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে চেক না পেলেও ২০২২ সালে একসঙ্গে চেক পেয়েছেন ১০ জন। এরা প্রত্যেকেই নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। মাস দুয়েক আগে লভ্যাংশের চেক হাতে পেয়েছেন তারা।

এদেরই একজন পত্নীতলা উপজেলার শিহাড়া হলাকান্দর এলাকার বাসিন্দা মোফাজুল হক। ষাটোর্ধ্ব এ বৃদ্ধ জানান, প্রায় তিন দশক ধরে তিনি বাগান পাহারা দেন। এজন্য মাস দুয়েক আগে পেয়েছেন ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর আগে আরেক ধাপে ৪ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। সে টাকায় দুই দফা তিন বিঘা জমি কিনে তাতে বাগান করেছেন। সেখান থেকে আসা আয় দিয়ে পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখেই দিন কাটছে তার। আরো লাভের আশায় সামাজিক বনায়নের নতুন বাগান পরিচর্যায় নেমেছেন মোফাজুল হক।

ইতিহাস বলছে, বরেন্দ্রখ্যাত রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ৮ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে একসময় নিবিড় বনাঞ্চল ছিল। মোগল ও ব্রিটিশরা এখানে আসতেন বন্যপ্রাণী শিকারে। উনিশ শতকের শেষের দিকে এ অঞ্চলে চাষাবাদ শুরু হয়। এরপর থেকে ক্রমেই উজাড় হতে শুরু করে বনাঞ্চল।

১৮১৮-৫৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) রিপোর্টে বনাঞ্চল অর্ধেকে নেমে আসার তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে ১৯৪৫ সালে পাস হয় বেঙ্গল প্রাইভেট ফরেস্ট আইন। তার হাত ধরে অবশিষ্ট বনও নির্বিচারে উজাড় করেন স্থানীয় জমিদাররা। ধ্বংস হয় এখানকার জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে নেমে আসে খরা, সঙ্গী হয় অনাবৃষ্টি। কালক্রমে এ অঞ্চল হয়ে ওঠে অনেকটা মরুময়। এর প্রভাব গিয়ে পড়ে এ অঞ্চলের কৃষিতে।

রাজশাহী বন বিভাগ সূত্র বলছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে সেভাবে বনায়ন হয়নি বরেন্দ্র অঞ্চলে। ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে কমিউনিটি ফরেস্ট্রি প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহীসহ নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলায় শুরু হয় সামাজিক বনায়ন। এর ধারাবাহিকতায় ধাপে ধাপে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বন দপ্তর। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মেকাবেলা ছিল এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্প শুরু হয় ২০১৮-২০১৯  অর্থবছরে। এর পাশাপাশি ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে চালু হয় সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষা প্রকল্প। সামাজিক বনায়নের এসব প্রকল্পের সুফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষজন।

সূত্র মতে, রাজশাহী অঞ্চলে স্ট্রিপ বাগান রয়েছে ৬৮ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। উডলট রয়েছে ২ হাজার ২৪৪ দশমিক ৯৪ হেক্টর। কৃষি বাগান রয়েছে ৪০৭ হেক্টর। এ অঞ্চলের ৭৩৫ হেক্টর চরে গড়ে তোলা হয়েছে বাগান। এছাড়া ৩০৫ হেক্টর বাঁশ এবং ২২২ হেক্টর বেত বাগান রয়েছে। ৩৭ হাজার ৫৮৮ পুরুষ এবং ২১ হাজার ৪৩৭ নারীসহ এসব সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী রয়েছেন ৫৯ হাজার ২০৫ জন।

রাজশাহী বন বিভাগের ৫০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৮১-৮৬ পর্যন্ত কেবল সড়ক ও বাঁধের ধারে স্ট্রিপ এবং পতিত জমিতে উডলট বনায়ন হয়েছে। ১৯৮৬ সালের পর থেকে শুরু হয় কৃষি খেতে বনায়ন। পর্যায়ক্রমে এসব বাগানই উডলটে পরিণত হয়।

পদ্মা-মহানন্দা-আত্রাই অববাহিকাবেষ্টিত এ অঞ্চলের চরে বনায়ন শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। এরপর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে চর বনায়ন চলছে। এর পাশাপাশি ২০০০ সালের দিকে বাঁশ ও বেত বাগান তৈরি শুরু হয়। সম্প্রতি ২৫ হেক্টর বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির গাছের বাগান গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলে। একই সঙ্গে ২৫ হেক্টর গোলাপ এবং ৫ হেক্টর ঔষধি বাগানও গড়ে উঠেছে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব তালগাছ রোপণ করা হয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার। এককথায় ফের সবুজ হয়ে উঠছে বরেন্দ্রাঞ্চল। প্রাণ ফিরে পাচ্ছে প্রকৃতি। পাশাপাশি নিজেদের ভাগ্যও বদলাচ্ছে ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। 

বন দেখাশোনা করে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৪২ হাজার ৩০০ টাকা পেয়েছেন নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার ইসুবপুর ইউনিয়নের চকচান্দিরা এলাকার বাসিন্দা ফজলুর রহমান। ২০১৩ সালে এক অনুষ্ঠানে তার হাতে লভ্যাংশের সেই চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। একই গ্রামের কাশেম মুন্সি ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পেয়েছেন ১২ লাখ ১৪ হাজার ৯৯০ টাকার চেক। ২০০০ সালের পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে উপকারভোগীরা পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার ৩৬৯ টাকা। মূলত বনের কাঠ বিক্রির ৪৫-৫৫ শতাংশ লভ্যাংশ পেয়ে থাকেন যারা দেখাশোনা করেন। 

সূত্র বলছে, গত ২২ বছরে ৪৭ কোটি ৫১ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৪ টাকা আয় হয়েছে সামাজিক বনাঞ্চল থেকে। উপকারভোগী ছাড়াও ২০ শতাংশ হিসেবে ভূমির মালিকরা পেয়েছেন ৫ কোটি ৮৭ লাখ ৭২ হাজার ৮১০ টাকা। ৫ শতাংশ হারে ইউনিয়ন পরিষদের অংশ ২ কোটি ৫১ লাখ ৪১ হাজার ২৯০ টাকা। গাছ বিক্রির ১০ শতাংশ অর্থ জমা পড়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। বাকি ১০ শতাংশ ফের বনায়নে বিনিয়োগ করেছে বন বিভাগ।

নওগাঁর ধামইরহাটে ২০১৮-২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন আব্দুল মান্নান। এখন তিনি রাজশাহীর পবা উপজেলা উপজেলা বন কর্মকর্তা। জেলার তানোরেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। সামাজিক বনায়ন নিয়ে আব্দুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ধামইরহাট এলাকার লোকজন সামাজিক বনায়নে বেশি আগ্রহী। সরকারি বাগান নিজের বাগানের মতোই দেখাশোনা করেন। তারা এর ফলও পাচ্ছেন।’

বন বিভাগের হিসাবে, রাজশাহী অঞ্চলের সামাজিক বনায়নে এ পর্যন্ত ৫৯ হাজার ২০৫ জন যুক্ত হয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সামাজিক বনায়নে যুক্ত করা মোটেও সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ্।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে লোকজন ততটা আগ্রহী ছিল না। নানাভাবে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। ফলে অনেকেই কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই বন দেখাশোনা করেছেন, কিন্তু যখন লোকজন লভ্যাংশ পেতে শুরু করলেন, তখন থেকে সামাজিক বনায়নে আরো জনসম্পৃক্ততা বেড়েছে। সামাজিক বনায়নে সামগ্রিকভাবে এ অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন হয়েছে। সুরক্ষিত হয়েছে এখানকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ।’