যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় ফের ভাঙনের কবলে পড়েছে কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে নির্মিত শেখ রাসেল কুষ্টিয়া-হরিপুর সংযোগ সেতু রক্ষা বাঁধ। গত বছরের সেপ্টেম্বরেও বাঁধের একই অংশে ধসের ঘটনা ঘটেছিল। এবারো সেই একই জায়গায় ধসের ঘটনা ঘটে বলে নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিন।
গত বছর বাঁধের ধসে যাওয়া অংশ মেরামত তো হয়ইনি, অন্যদিক ঝুঁকিতে থাকা অন্য অংশ রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় আবারো এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন পাউবো ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কয়েকজন প্রকৌশলী।
ভাঙনে এরই মধ্যে সেতুর হরিপুর অংশের ১৫০ মিটার উজান ও ১০০ মিটার ভাটির প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ৪০-৪৫ মিটার ব্লক গড়াই নদীতে চলে গেছে।
প্রতিদিনই বাড়ছে ভাঙন।
ধসের স্থান থেকে সেতুর দূরত্ব রয়েছে মাত্র ১৫০ মিটার।
আশপাশেই রয়েছে অসংখ্য বসতভিটা।
কুষ্টিয়া এলজিইডি সূত্র জানায়, গত বছর যখন বাঁধে ধসের সৃষ্টি হলে একটি প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠানো হয়।
ঢাকা থেকে এলজিইডির দুটি টেকনিক্যাল টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করে।
তাদের নির্দেশনা মোতাবেক ধসে যাওয়া বাঁধে পুনরায় ব্লক প্রতিস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৩২ লাখ টাকা অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু এখনো সেই অনুমোদন মেলেনি।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান মন্ডল।
তিনি জানান, প্রথম দফায় গত বছরের ১০ অক্টোবর ধস নামার পর দুটি অংশ মেরামতের জন্য এ অর্থ চাওয়া হয়েছিল।
তবে অর্থ কেন ছাড় করা হয়নি, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
সেতু নির্মাণ করার দায়িত্ব এলজিইডির।
কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাউবোর।
একটি সূত্র জানায়, প্রস্তাবকৃত অর্থ কুষ্টিয়া এলজিইডি নাকি পাউবোকে দেয়া হয়ে হবে, এ ধরনের একটি রশি টানাটানি সৃষ্টি হলে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি আটকে যায়।
তব এ বিষয়ে এ দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তাই কিছু জানেন না বলে জানান।
কুষ্টিয়া শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গড়াই নদীতে এলজিইডির তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালের ২৪ মার্চ সেতুটি উদ্বোধন করা হয়।
সেতুর দৈর্ঘ্য ৬০৪ মিটার ও প্রস্থ ৬ দশমিক ১ মিটার।
এটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৮ কোটি টাকা।
সেতুর উভয় পাশে ৪১০ মিটার ব্লক বাঁধ নির্মাণ করা হয় আরো ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে।
এর মধ্যে হরিপুর অংশে সেতুর পশ্চিম ও পূর্ব পাশে প্রায় ৩০০ মিটার বাঁধে নির্মাণের চার বছরের মধ্যে ধসের সৃষ্টি হয়।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার ব্লক ভেঙে গড়াই নদীতে তলিয়ে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সংযোগ সেতু রক্ষা বাঁধে ধসের পাশাপাশি এরই মধ্যে নদীপাড়ের গাছপালা, রাস্তাসহ পানির ওপরের ব্লকও নদীতে চলে গেছে।
বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে বাঁধের বিভিন্ন জয়গায়।
নির্মাণের এত অল্প সময়ের মধ্যে কেন এ ধরনের ধস, এ নিয়ে এলজিইডি ও পাউবো কর্মকর্তাদের মধ্যে নানা মত রয়েছে।
এলজিইডির এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করে জানান, ডাম্পিং না করে ব্লক প্রতিস্থাপন করার কারণেই এ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
ব্লক স্থাপনের আগে জায়গাগুলো ব্যাপকভাবে ডাম্পিংয়ের অধীনে এনে শাসন করা দরকার ছিল।
এখানে সেটি হয়নি।
দীর্ঘ সময় ধরে সেতুর নির্মাণকাজ চললেও সেতু প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণে তেমন সময় দেয়া হয়নি বলে জানান নির্মাণ বিশেষজ্ঞরা।
অনেক সময় নিয়ে বাঁধের নদী শাসন প্রয়োজন ছিল।
গড়াই নদীতে এ সেতু নির্মাণ আন্দোলনে ছিলেন প্রকৌশলী এমএ হাফিজ অভি।
প্রকৌশলী অভি জানান, বাঁধ নির্মাণের সময় ব্লকগুলো সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন হয়নি।
ধসে যাওয়া ব্লকের নিচে কোনো জিও ব্যাগ স্থাপন করা হয়নি।
শুধু বালির ওপর সিনথেটিক অ্যাপ্রোন দিয়ে ব্লক বসানো হয়েছিল।
এ কারণে বাঁধের যে জায়গাটিতে প্রবল স্রোতের আঘাত সৃষ্টি হয়েছে, সেখানেই ব্লক উঠে গেছে।
এত অল্প সময়ে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।
এলজিইডি কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রকাশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, গত বছর ধসে যাওয়া ব্লক পুনরায় স্থাপিত না হলে এ বছরের ভারি বর্ষণে আবার ধস সৃষ্টি হতে পারে বলে আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছিল।
কিন্তু ওপর থেকে কোনো উদ্যোগ ছিল না।
এদিকে প্রতিরক্ষা বাঁধের এ ধস উজানে শুরু হলে তা সেতুর দিকে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করলেও এলজিইডি কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান মন্ডল ব্লকের একটি অংশে ধসের কারণে মূল সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, সেতু এক নিয়মে তৈরি আর প্রতিরক্ষা বাঁধ আরেক নিয়মে করা হয়।
হয়তো বাঁধের মাটি শাসন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি।
তাই এ ধসের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, তারা কাজ গুছিয়ে এনেছেন। এরই মধ্যে কিছু অতি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় মাটি ফেলা হয়েছে। ঢাকা অফিস থেকে ডিজাইন সেলের টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে। মেরামত প্রকল্পের প্রাক্কলন ঢাকায় পাঠানো হবে হেড অফিসের ডিজাইন সেলে। সেখান থেকে অনুমোদন হলেই বাজেট তৈরি হবে।










