কাছে গিয়ে কথা বলতেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, প্রতি কেজি মাল্টা ৩৩০ টাকা দরে কিনতে হয়েছে তাকে। অথচ রমজানের আগেও এ মাল্টার দাম ছিল ২৩০-২৫০ টাকার আশপাশে। রমজানের শুরুতেই বাজারে ফলের দাম এমনভাবে চড়া হয়ে উঠেছে যে নিম্নবিত্তের কাছে তা কার্যত নাগালের বাইরে চলে গেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও বর্তমান দামে প্রয়োজনীয় ফল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ইফতারের জন্য ন্যূনতম কয়েকটি ফল তুলতেই আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি ও খুচরা বাজার কারওয়ান বাজার সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি ফলের দাম কেজিতে বা ডজনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ কলার দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। গত সপ্তাহে ১০০-১২০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হওয়া সবরি কলা এখন ১৬০ টাকা। সাগর কলা ৮০ থেকে বেড়ে ১২০ টাকা এবং বাংলা কলা ১০০-১২০ টাকা ডজনে বিক্রি হচ্ছে। বিদেশী ফলের বাজার আরো চড়া। ভালো মানের প্রতি কেজি আপেল ৩৫০-৪০০ টাকা কেজি, যা আগে ছিল ৩০০ টাকার মধ্যে। সবুজ আঙুর ৪২০-৪৫০ টাকা এবং কালো আঙুর বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকা কেজি দরে। ইফতারের জনপ্রিয় ফল মাল্টা এখন ৩৩০ টাকা কেজি, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ২৫০ টাকার কম দামে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক কেজি আঙুর বা আপেল কেনা এখন রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইফতারের শরবতের জন্য অপরিহার্য লেবুর প্রতি হালি গিয়ে ঠেকেছে ৮০-১২০ টাকায়।
মৌসুমি ও দেশী ফলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বাজারে নতুন আসা তরমুজ পিস হিসেবে নয়, বরং ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পেঁপে ১৭০-১৮০ টাকা, পেয়ারা ১৩০ টাকা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালে থাকা দেশী কুল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া বিদেশী ফল আনার বা বেদানা ৫২০-৫৬০ টাকা এবং রসালো স্ট্রবেরি ৬০০-৭০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সবচেয়ে বড় বিপত্তি দেখা দিয়েছে ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরে। মানভেদে খেজুর ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি আজওয়া বিক্রি হচ্ছে ৯০০-১০০০ টাকায় এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির খেজুর ১৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া প্রতি কেজি পাকা পেঁপে ১৭০-১৮০ টাকা এবং পেয়ারা ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশী ফলের মধ্যে ছোট আকারের বরই ৭০ টাকা হলেও উন্নত মানের কুল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে। একটি ছোট আকারের আনারসের দাম প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা। প্রতিটি বেলের দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। সফেদা ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
একজন চাকরিজীবী ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রমজানের অজুহাতে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। পরিবারের সবাই রোজা রাখছেন বলেই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।»বাজারে প্রচুর সরবরাহ থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে বিক্রেতারা এ চড়া দাম আদায় করছেন বলে অভিযোগ সাধারণ ক্রেতাদের।
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী হাতে এক ছড়ি সবরি কলা নিয়ে দাঁড়িয়ে। কাছে গিয়ে দাম জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভয়াবহ দাম। যে কলা গত সপ্তাহে ১০০ টাকায় কিনেছি, আজ তা ১৬০ টাকা। পরিবারের সবার রোজা ও ইফতারে একটু ফল না হলে চলে না, তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামেই কিনলাম।’
আরেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবকিছু হিসাব ছাড়া দাম। দামে কুলাইতে পারি না, আবার ইফতারে পরিবারের জন্য ভালো খাবার তুলে দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাজারে কোনো তদারকি নেই বলেই এত বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’ অধিকাংশ ক্রেতারই অভিযোগ—বাজার মনিটরিং না থাকায় রমজানকে পুঁজি করে বিক্রেতারা পকেট কাটছে।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পাইকারি বাজার বা আড়তদারদের। একজন কলা বিক্রেতা জানান, রোজার মাস শুরু হতেই কলার আড়তে প্রতি পুন (২০ হালি) কলা আমাদের ১০০-১৫০ টাকা বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনলে তো কম দামে বেচতে পারি না।»
অন্য বিক্রেতারা বলছেন, রমজানে ফলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম কিছুটা বাড়তি। আড়ত থেকে দাম না কমলে খুচরা বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা নেই বলেও তারা জানান।
আমদানীকৃত ফলের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা দেশী ফলের দিকে ঝুঁকলেও সেখানেও স্বস্তি নেই। সব মিলিয়ে রমজানে ফলের বাজারে ঊর্ধ্বগতির এ প্রবণতা মধ্যবিত্তের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। দ্রুত বাজার তদারকি জোরদার না করলে ইফতারের ফল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সাধারণ মধ্যবিত্তরা।









