সুবিশাল দৃষ্টিনন্দন ভবন। বড় করে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা বাংলাদেশ আমেরিকা সৌহার্দ ফুল বিপণন কেন্দ্র। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মিলল বীজ বিপণন ও সংরক্ষণের জন্য হিমাগার। ভবনটির সামনে ফুল প্যাকেজিং আর বিক্রির জন্য পাকা মেঝে আর টিনের ছোট ছোট শেড। তবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও ফুল বেচাকেনা, বীজ সংরক্ষণই হয় না এখানে। অথচ মার্কেটের সামনে দিয়েই মাঠ থেকে ফুল নিয়ে চাষীরা বিক্রি করতে যান সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গদখালী ও পানিসারা এলাকায় উৎপাদিত ফুল ও বীজ বিপণন এবং সংরক্ষণের জন্য ২০২১ সালে সাড়ে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে হিমাগারসহ আধুনিক ফুল মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়। এক একর জমিতে মার্কেট নির্মাণের পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চালু করা যায়নি। যে মার্কেটে ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর থাকার কথা, সেটি ফুলের পরিবর্তে ধান বা অন্য ফসল শুকানোর কাজে ব্যবহার হচ্ছে। পড়ে রয়েছে ফুল বেচাকেনার শেডও।

কারণ হিসেবে চাষীরা বলছেন, গদখালী বাজার থেকে পানিসারায় অবস্থিত মার্কেটটি সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। গদখালী বাজার থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফুল পাঠানো সহজ হওয়ায় পানিসারা ফুল বিপণন কেন্দ্রে চাষীদের আগ্রহ কম।

নূরনবী নামে এক ফুলচাষী বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে। গদখালী থেকে দূরে হওয়ায় চাষীরা ওখানে যেতে চান না। বাজার থেকে সহজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফুল পাঠানো যায়। তাই দীর্ঘদিন ধরে ফুল মার্কেটটি পড়ে রয়েছে। এতে এদিকে বীজ সংরক্ষণ করতে না পারায় ফুলচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্য চড়া দামে যশোর ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার আলুর হিমাগারে ফুলের বীজ সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। তাও আবার অনেক সময় হিমাগারে জায়গা পাওয়া যায় না।’

একই অবস্থা গদখালী বাজারের পাশেই ১ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত অ্যাসেম্বল সেন্টারটিরও। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সেখানে যান না চাষীরা। বছরের পর বছর পড়ে রয়েছে অ্যাসেম্বল সেন্টারটি।

যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, ‘প্রথমে জায়গাটির মালিকানা নিয়ে সমস্যার কারণে চালু হয়নি। পরে সেটি সমাধান হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী মার্কেটটি চালু করতে দিচ্ছেন না।’

অন্যদিকে যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকায় ৮০ শতক জমির ওপর ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। দোতলা বিক্রয় কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মৎস্য বিভাগের কাছে তা হস্তান্তর করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

সরজমিন দেখা গেছে, পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটির নিচতলার ১১ হাজার বর্গফুট জায়গায় কার্পজাতীয় মাছের পোনা বিক্রির জন্য ৩২০ বর্গফুটের ৫১টি সিস্টার্ন (হাউজ) নির্মাণ করা হয়েছে। সিস্টার্নে পানি শাওয়ারিং ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশী প্রজাতির ছোট মাছের পোনা বিক্রির জন্য দোতলায় ৭ হাজার ৯০০ বর্গফুট জায়গা রয়েছে। সেখানে ৭০ জন ব্যবসায়ী বড় হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে পোনা বিক্রি করতে পারবেন। মাছের গাড়ি সরাসরি দোতলায় নেয়ার জন্য র‌্যাম্প পদ্ধতির সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য স্বয়ংক্রিয় জেনারেটরও স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও বিক্রেতারা জায়গা বরাদ্দ নিতে আগ্রহ দেখাননি।

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, চাঁচড়া বাবলাতলায় রাস্তার ওপর পাতিলে মাছের পোনা রেখে বিক্রি করতে কোনো খরচ নেই। কিন্তু পোনা বিক্রয় কেন্দ্রে জায়গা বরাদ্দ নিতে অফেরতযোগ্য ২৫ হাজার টাকা জামানত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে আরো অন্তত ১ হাজার টাকা খরচ হবে। তাই তারা ওই কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হননি।

জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হ্যাচারি মালিকদের মতামত উপেক্ষা করে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে। চাঁচড়ার বাবলাতলায় মার্কেট নির্মাণের দাবি জানালেও তৎকালীন মৎস্য কর্মকর্তা চাঁচড়ায় নির্মাণ করেন। সেখানে পর্যাপ্ত জায়গা নেই, পানির সমস্যা রয়েছে। যেহেতু চাষীদের হাফা চাঁচড়ার বাবলাতলায়, তাই হ্যাচারি মালিকরা দেড় কিলোমিটার দূরে যেতে আগ্রহ দেখান না।’

অবশ্য চাষীদের মতামতের ভিত্তিতে সমস্যাগুলো সমাধান করে দ্রুত মার্কেটগুলো চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলাম।