নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় দেশজুড়ে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে জনস্বার্থে ফার্মেসি ও নিত্যপণ্যের বাজার খোলা রাখা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ছাড়াই চলছে তাদের কার্যক্রম। ওষুধ বিক্রয়কর্মীরা গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করে সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও সবজি ও মাছ-মাংসের বাজারে বিক্রেতাদের কোনো সুরক্ষা উপকরণই নেই। অথচ সারা দিনই নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শে আসছে তারা। জরুরি এসব সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে ভাইরাসটির কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা বরাবরই সবাইকে সুরক্ষা উপকণ ব্যবহারের জন্য বলছি। ওষুধ বিক্রয়কর্মী হোক আর কাঁচাবাজরের ব্যবসায়ী হোক, সবাইকেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করার জন্য আমরা বলেছি। অন্তত আজ পর্যন্ত যেন নিজেদের জন্য হলেও যতটা সম্ভব সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করা হয়।
সাধারণ ছুটির মধ্যেও প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে খোলা থাকছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের অয়ন ফার্মেসি। রোগী ও তাদের স্বজনদের হাত থেকে চিকিৎসকের দেয়া ব্যবস্থাপত্র নিয়ে সে অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ করছেন ফার্মেসির বিক্রয়কর্মী। সংক্রমণ রোধে ওই বিক্রয়কর্মীর পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারের কথা থাকলেও এক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত। মাস্ক থাকলেও তা মুখ থেকে নিচে নামানো। আর কোনো গ্লাভস ছাড়াই ওষুধ ও টাকা লেনদেন করছেন তিনি। শুধু রাজধানীর এ ফার্মেসিতেই নয়, পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ছাড়া প্রতিদিনই এভাবে ক্রেতাদের সংস্পর্শে আসছে দেশের দুই লাখেরও বেশি ওষুধ বিক্রেতা।
সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার না করার কারণ জানতে চাইলে অয়ন ফার্মেসির ওই বিক্রয়কর্মী জানান, গ্লাভস না থাকলেও কিছুক্ষণ পরপর তিনি স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নেন। আর অতিরিক্ত গরমের কারণে সার্বক্ষণিক মাস্ক পরে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ২৫ হাজার নিবন্ধিত ওষুধের দোকান রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৮ হাজার দোকানের কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন নেই। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে ফার্মেসি রয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার। এসব দোকানে কর্মরত দুই লাখেরও বেশি মানুষ।
সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কেবল মডেল ফার্মেসিগুলোতেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণসহ দায়িত্ব পালন করছেন বিক্রয়কর্মীরা। অধিকাংশ ফার্মেসির বিক্রয়কর্মীরাই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করছেন না। কেবল গ্লাভস আর মাস্ক ব্যবহার করে সংক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন তারা। পাড়ামহল্লাগুলোয় থাকা ফার্মেসিতে এ পরিস্থিতি আরো আশঙ্কাজনক। সেগুলোর অধিকাংশ বিক্রয়কর্মীই কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করছেন না। মানছেন না নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনাও।
ফার্মেসির বিক্রয়কর্মীরা জানান, অন্য সময়ের তুলনায় এখন বেচাবিক্রি অনেক বেশি। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের শঙ্কায় তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীদের তো দেখছেই না, পাশাপাশি অন্য রোগে আক্রান্তদেরও চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। এমন অবস্থায় অধিকাংশ রোগীই নিকটস্থ ফার্মেসিতে গিয়ে নিজের মতো করে প্রাথমিক ওষুধগুলো সংগ্রহ করছে। এ কারণেই ফার্মেসিতে ক্রেতাদের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
রাজধানীর ফার্মেসিগুলোয় করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় অন্তত কিছুটা সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করা হলেও জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের ফার্মেসিগুলোয় কিছুই মানা হচ্ছে না। হরহামেশাই রোগী ও স্বজনরা ফার্মেসিতে আসছে। নিজেদের চাহিদা জানিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করে ফিরে যাচ্ছে। কোনো প্রকার সুরক্ষা উপকরণ ছাড়াই তাদের সঙ্গে লেনদেন সম্পন্ন করছে ওষুধ বিক্রেতারা।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির (বিসিডিএস) সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন রনি বণিক বার্তাকে বলেন, সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পিপিইর চাহিদা দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আমরা টাকা দিয়ে সেটা কিনে নেব। আমাদের মনে রাখতে হবে, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হলে ফার্মেসি, কাঁচাবাজার ও রেস্তোরাঁ থেকেই হবে। কারণ এ তিনটা জায়গায় প্রতিদিনই নানা ধরনের মানুষ আসে। প্রাথমিকভাবে আমরা সব ফার্মেসির বিক্রয়কর্মীদের গ্লাভস, মাস্ক ও ক্যাপ ব্যবহার কারার জন্য বলেছি। পাশাপাশি হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করার জন্য বলেছি।
এদিকে সুরক্ষা উপকরণ ছাড়া বাজারে বেচাকেনা করছেন কয়েক হাজার খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী। পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার না করার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গরম ও সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারে অনভ্যস্ততাই কারণ বলে জানান তারা। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারওয়ান বাজারে সবজি বিক্রি করেন আউয়াল মিয়া। সাধারণ ছুটির মধ্যেও ক্রেতার চাহিদা বিবেচনায় নিয়মিতই বাজারে বসছেন তিনি। সংক্রমণ রোধে তিনি কেবল মাস্ক ব্যবহার করছেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ গরমে গ্লাভস পরে দীর্ঘ সময় থাকা যায় না। হাত গরম হয়ে ঘামতে শুরু করে। এভাবে দীর্ঘ সময় কাজ করা কঠিন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ছাড়া সবজি বাজার বা মাছ-মাংসের বাজারে বিক্রেতাদের কার্যক্রম পরিচালনা নিরাপদ নয়। আমরা দেখছি যে নিজেদের সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে ক্রেতারা যতটুক সম্ভব সুরক্ষা উপকণ ব্যবহার করছে এবং নিরাপদ দূরত্বও বজায় রাখছে। কিন্তু বাজারের বিক্রেতাদের মধ্যে সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার না করার প্রবণতা রয়েছে। ফলে তাদের মধ্য থেকেই করোনা কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে সাধারণ ছুটির মধ্যেও জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় যেসব সেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে, তাতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারের বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিতভাবে জরুরি সেবায় নিযুক্ত কর্মীদের সচেতন করতে কাজ করছে পুলিশ। পাশাপাশি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেও বিক্রেতাদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এর পরও কেউ যদি সরকার নির্ধারিত এসব নির্দেশনা মেনে না চলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।










