জেনারেটর চালিয়েও দিনে ৩০ টনের বেশি চাল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মিলটির মালিক আবদুস সামাদ। তার দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদেরও অলস বসে থাকতে হচ্ছে। মজুরি ঠিকই দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে কার্যক্রম কিছুটা সচল রাখতে জেনারেটর চালাতে গিয়ে ডিজেলের পেছনে গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। এতে বেড়ে যাচ্ছে চালের উৎপাদন ব্যয়।
কেবল স্বর্ণা অটো রাইস মিল নয়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে দেশের বিভিন্ন চাল উৎপাদনকারী জেলাগুলোর মিলাররাও সংকটে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, লোডশেডিংয়ে উৎপাদন কমার পাশাপাশি বেড়েছে ব্যয়। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এর প্রভাব চালের সরবরাহ ও বাজারেও পড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
দেশের অন্যতম বড় চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগর। এখানকার চালকলগুলো থেকে উৎপাদিত চাল স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ফলে এ অঞ্চলের উৎপাদন ব্যাহত হলে বৃহত্তর বাজারেও সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই ধরনের প্রভাবের কথা জানিয়েছেন ধান-চাল উৎপাদনে প্রসিদ্ধ নওগাঁর চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরাও।
চাল উৎপাদনের বড় কেন্দ্রগুলোর মিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অটো ও সেমি-অটো রাইস মিলের অধিকাংশ কার্যক্রমই বিদ্যুৎনির্ভর। ধান শুকানো, সেদ্ধ করা, মাড়াই, ভাঙানো, পলিশ ও প্যাকেজিং—প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। ঘন ঘন লোডশেডিং হলে শুধু উৎপাদন বন্ধই হয় না, বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি পুনরায় চালু করে তা স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে বাড়তি সময় লাগে।
মিল মালিকরা বলছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে যন্ত্রপাতিতে কাঁচামাল আটকে যাওয়াসহ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটছে। ফলে বিদ্যুৎহীন থাকা সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গিয়ে প্রতি কেজি চালে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
স্বর্ণা অটো রাইস মিলের মালিক আবদুস সামাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আমাদের উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। শ্রমিকরা কাজে এসে বসে থাকছেন, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ করতে পারছেন না। আবার উৎপাদন না হলেও তাদের ঠিকই মজুরি দিতে হচ্ছে। জেনারেটর চালাতে হলে ডিজেলের পেছনে অতিরিক্ত খরচও লাগছে।’
লোডশেডিংয়ে সামগ্রিকভাবে চালের উৎপাদন কতটা কমেছে, সে বিষয়ে অবশ্য এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য সমন্বিত তথ্য পাওয়া যায়নি। খাজানগরের মিল মালিকদের দাবিতেও রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। কেউ উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমার কথা বলছেন, আবার কেউ দাবি করছেন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তা ৬০-৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে প্রকৃত উৎপাদন ঘাটতি ও বাড়তি ব্যয়ের হিসাব যাচাইয়ের আগেই বিদ্যুৎ সংকটকে চালের দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, সে প্রশ্নও রয়েছে।
খাজানগরে প্রায় আড়াইশটি ছোট-বড় চালকল রয়েছে। এসব মিলের একটি অংশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি) এবং অন্য অংশ পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন। মিল মালিকদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতের সংযোগে থাকা মিলগুলোয় লোডশেডিংয়ের প্রভাব তুলনামূলক বেশি।
কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহ ধরে চাহিদার তুলনায় জেলায় বিদ্যুতের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুষ্টিয়ায় পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮০ মেগাওয়াট। কিন্তু গত দুই-এক সপ্তাহে চাহিদার তুলনায় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। এ কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে পরিবহনেও। নওগাঁ থেকে ধান নিয়ে আসা ট্রাকচালক মিজানুর রহমান জানান, মিলের কার্যক্রম ধীর হয়ে যাওয়ায় ট্রাক থেকে পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে ট্রিপ কমে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চালকলগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উৎপাদন যাতে বড় ধরনের বাধার মুখে না পড়ে, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা চলছে।’
নওগাঁর চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ জেলায় বছরে ১৬ লাখ টনের মতো চাল উৎপাদন হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রফতানি ও বিভিন্ন জেলায় ১২ লাখ টনের মতো চাল সরবরাহ করে নওগাঁ। জিরাশাইল, সম্পা কাটারী, স্বর্ণা-৫ ও সুগন্ধি জাতের চালের সবচেয়ে বেশি সরবরাহ হয় এ জেলার চালকলগুলো থেকেই। এ অঞ্চলে ৫২টি অটোমেটিক রাইস মিলসহ ছোট-বড় চালকল রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ।
নওগাঁর মিল মালিকরা বলছেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে তাদের চালের মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ধান ড্রায়ারে দেয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বের করতে না পারায় অনেক সময় মান খারাপ হচ্ছে। উৎপাদনে সময় বেশি লাগায় শ্রমিকের মজুরিও বাড়ছে। চালের মান ধরে রাখতে না পারলে বাজার হারানোর শঙ্কাও করছেন তারা।
বাংলাদেশ অটোমেটিক রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নওগাঁর সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুল ইসলাম বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অটোমেটিক রাইস মিলগুলোয় প্রায় একশর বেশি মোটর ব্যবহার করতে হয়। গত কয়েকদিনের ক্রমাগত লোডশেডিংয়ে মোটরগুলো পুড়ে যাচ্ছে। প্রতিবার বিদ্যুৎ গেলে এক-দেড় ঘণ্টা পর পুনরায় আসছে। আর অটোমেটিক রাইস মিল একবার বন্ধ হলে সেটি পুনরায় চালু করতে আবারো অনেকটা সময় লেগে যায়। এর ফলে জেলায় চাল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সবাই উদ্বিগ্ন।’
গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশীয় মোকাম ছাড়াও নওগাঁর চাল রফতানি হয় বলে জানান নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘জেলা থেকে প্রচুর সুগন্ধি চাল বিদেশে রফতানি হচ্ছে। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে চালের মান কিছু ক্ষেত্রে খারাপ হতে শুরু করেছে। এটি অব্যাহত থাকলে দেশ ও বিদেশে বাজার হারাতে পারে নওগাঁর চাল।’
বর্তমানে নওগাঁর মোকাম ও মিলগেটগুলোয় চালের চাহিদা কিছুটা কম বলেও জানান নওগাঁর চালকল মালিক গ্রুপের এ নেতা। তিনি বলেন, ‘এর ফলে উৎপাদনের গতি কমলেও বাজারে এর তেমন প্রভাব পড়ছে না। তবে সমস্যা সমাধান না হলে আর চাহিদা বাড়লে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। সেজন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
একই সংকটের কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহের চালকল মালিকরা। তারা বলছেন, গড়ে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেলার ঈশ্বরগঞ্জের তালুকদার অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী মোবারক তালুকদার বলেন, ‘ব্যবসায় এমনিতেই মন্দা চলছে। তার ওপর চরম লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজ আরো সংকট বাড়িয়েছে। প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, চালের বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর একাধিক উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। ধানের দাম, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি, মজুদ পরিস্থিতি ও মৌসুমি চাহিদার পাশাপাশি মিল পর্যায়ের উৎপাদন ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু মিল পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ধাপে ধাপে তা পাইকারি ও খুচরা বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বণিক বার্তাকে বলেন, লোডশেডিংয়ের প্রভাবে চালকলগুলো ঠিকমতো চলতে পারবে না। একই ঘটনা ঘটবে আটা কল থেকে শুরু করে গার্মেন্টস সব জায়গায়। ফলে লোডশেডিং দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বুধবার পর্যন্ত সরকারের কাছে ২৪ লাখ ১ হাজার ৭৪৪ টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল। এর মধ্যে চাল ছিল ২০ লাখ ৫২ হাজার ৬৫৯ টন। অন্যদিকে চালকল মালিকদের গোডাউনেও বড় মজুদ থাকে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যেন চালের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটা না হয় সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিলারদের গোডাউনে লাখ লাখ টন চাল মজুদ থাকে। যেসব মজুদ থাকে সেগুলো দিয়ে দেশ দেড়-দুই মাস ভালোভাবেই চলবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট আছে এটি বাস্তবতা। কিন্তু এটিকে ব্যবহার করে মিলাররা দাম বাড়ানোর যেন পাঁয়তারা না করতে পারে সেজন্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে কাজ করতে হবে। বাজার মনিটরিং এবং গোডাউনে থাকা চাল বাজারে ছাড়তে হবে। কোনোভাবেই ভোক্তার পকেট কাটতে দেয়া যাবে না। প্রশাসনকে কঠোর থাকতে হবে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পিক সময়ে (সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা) দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭৫৯ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং ছিল ৯৩৫ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বেশি ৫২২ মেগাওয়াট ময়মনসিংহ অঞ্চলে এবং ২৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল ঢাকা অঞ্চলে। আগের দিন বুধবার পিক সময়ে (সন্ধ্যা ৭টায়) দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ১০৬ মেগাওয়াট। ওইদিন লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫৩৮ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৫৭৫, ঢাকায় ৪৪৫, রাজশাহীতে ৩৩৭, কুমিল্লায় ৩২৪, খুলনায় ৩০৩, রংপুর অঞ্চলে ২৯৩ এবং সিলেট অঞ্চলে লোডশেডিং ছিল ২৫৬ মেগাওয়াট। ১১ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার পিক সময়ে চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট।
লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের খাদ্যশস্যের সরবরাহে কোনো সংকট তৈরি হবে কিনা, এমন প্রসঙ্গে জানতে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খানের মন্তব্য জানতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কুষ্টিয়া, নওগাঁ ও ময়মনসিংহ প্রতিনিধি










