ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ বিতরণ নেই বললেই চলে। তার পরও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত নিয়ে ব্যাংকগুলোর কাড়াকাড়ি থামছে না। বেশি সুদ দিয়ে এক ব্যাংক থেকে আমানত বাগিয়ে নিচ্ছে অন্য ব্যাংক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমানতের সুদহার উঠে যাচ্ছে ৯ শতাংশের বেশি। যদিও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে দেশের সব ব্যাংকের ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে নেমে আসার কথা।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সুনামির এ সময়েও ব্যাংকগুলো কেন বেশি সুদে আমানত ভাগাচ্ছে, তার জবাব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকারদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এমন চেয়ারম্যান বা পরিচালকদের ব্যাংকগুলোই বেশি সুদে আমানত টানছে। এতে বিশেষ কিছু ব্যাংকের আমানত বাড়লেও কমছে অন্য ব্যাংকগুলোর। ফলে প্রতিষ্ঠানিক আমানত ধরে রাখা নিয়ে বিপদে পড়েছেন অনেক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা। আমানত বেরিয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

চলতি বছরের মার্চের শুরু থেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়ার জন্য ভিড় করেন গ্রাহকরা। করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রাহকদের ভিড় বাড়ে ব্যাংকে। পরে করোনার সংক্রমণ রোধে ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে জনজীবনের পাশাপাশি স্থবিরতা নেমে আসে ব্যবসা-বাণিজ্যে। ব্যাংকেও নতুন করে ব্যক্তি শ্রেণীর আমানত জমা হওয়ার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ব্যাংকের ভরসা হয়ে দাঁড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক আমানত।

ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণের হারে (সিআরআর) ১ দশমিক ৫০ শতাংশ কমানোর মাধ্যমে বাজারে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার নগদ অর্থ জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো যাতে কম সুদে ঋণ পায়, এজন্য কমানো হয়েছে নীতি সুদহার (রেপো)। ৬ শতাংশ থেকে রেপোর সুদহার নামিয়ে আনা হয়েছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে। এতে কম সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছে ব্যাংকগুলো। একই সঙ্গে ব্যাংকের হাতে থাকা অতিরিক্ত সরকারি সিকিউরিটিজ কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) সংরক্ষণের পর অতিরিক্ত সরকারি সিকিউরিটিজ থাকলে তা প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাজারমূল্যে বিক্রি করতে বলা হয়। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর হাতে এসএলআরের অতিরিক্ত সরকারি সিকিউরিটিজ আছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সীমাও (এডিআর) ২ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর এডিআর ৮৫ থেকে ৮৭ শতাংশ এবং ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর আইডিআর ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ করা হয়েছে।

ব্যাংকের হাতে তারল্য বাড়াতেই এসব উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার পরও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত নিয়ে কাড়াকাড়ি কেন বন্ধ হচ্ছে না, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অন্তত ছয়টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামেনি। কথা ছিল ব্যাংকিং খাতে ১ এপ্রিল থেকে ৬-৯ বাস্তবায়ন হবে। এক্ষেত্রে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ হলেই ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামার কথা। কিন্তু আমরা ঋণের সুদহার কমালেও আমানতের সুদহার কমেনি।

তিনি জানান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতও ৬ শতাংশ সুদে পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংকও ৯ শতাংশ সুদের নিচে তিন মাস মেয়াদি আমানত দিচ্ছে না। কিছু ব্যাংক ৮ শতাংশের বেশি সুদ দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত সংগ্রহ করছে। কস্ট অব ফান্ড যোগ করলে এ সুদহার ১১ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। ওই ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ সুদে কীভাবে ঋণ দেবে, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়েও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক এ চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। আমরা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি) হিসেবে যে আমানত দিই, তা ব্যাংকের বিনিয়োগ। এজন্য ৯ শতাংশ সুদের নিচে কোনো ব্যাংককে তিন মাস মেয়াদি আমানত দেয়া হচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আমার ব্যাংকে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের ৫০০ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী আমানত ছিল। সম্প্রতি মেয়াদ শেষ হলে আমরা প্রতিষ্ঠানটিকে ওই আমানতের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করি। প্রতিষ্ঠানটি আমাদের কাছে ৮ শতাংশের বেশি সুদ দাবি করে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচারে আমরা সুদ কিছুটা কমানোর প্রস্তাব করলে প্রতিষ্ঠানটি পুরো আমানতের অর্থই অন্য একটি ব্যাংকে নিয়ে যায়। ওই ব্যাংকটি সাড়ে ৮ শতাংশ সুদ দিয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত আমার ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার বেশি প্রাতিষ্ঠানিক আমানত কমে গেছে।

প্রায় একই অভিযোগ করেন ২০১৩ সালে যাত্রা করা একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীও। ওই ব্যাংকটিরও প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রাতিষ্ঠানিক আমানত কমেছে। অন্য ব্যাংকগুলো বেশি সুদে ওই আমানত নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ তার।

দেশে ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা হচ্ছে প্রায় দুই বছর ধরে। সরকার থেকে ঋণের সুদহার কমানোর জন্য কয়েক দফায় সময়সীমা বেঁধে দেয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের প্রথম দিন থেকেই ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকর্স (বিএবি) এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার জন্য ১ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়। সে অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যেই বিশ্বব্যাপী নেমে আসে করোনা দুর্যোগ। এ দুর্যোগ স্থবির করে দিয়েছে বাংলাদেশের জনজীবন ও অর্থনীতিকেও।

তবে ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় ব্যাংকগুলো। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে অভিযোগ ব্যাংকারদের।

করোনাভাইরাস বিপর্যয় নেমে আসার বছর দুই আগে থেকেই খরা যাচ্ছিল দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে। প্রায় এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। যদিও ব্যাংকারদের বক্তব্য হলো পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান ঋণ প্রবৃদ্ধির মধ্যে নতুন ঋণ খুবই কম। এক্ষেত্রে অনাদায়ী সুদ ও সরকারি কার্যাদেশের বিপরীতে অর্থায়নই বেশি। আর ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বিতরণ নেই বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতেও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত নিয়ে টানাটানিকে ভালো চোখে দেখছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত সিআরআর, রেপো ও সরকারি সিকিউরিটিজের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগযোগ্য তারল্য গিয়েছে। ব্যাংকের এডি রেশিও সীমা ২ শতাংশ বাড়ানোর ফলে এডিআর সমন্বয়ের দুশ্চিন্তাও নেই। করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও গঠন করেছে। তার পরও ব্যাংকগুলো কেন আমানত নিয়ে টানাটানি করছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

তবে একাধিক ব্যাংক এমডির অভিযোগ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার বেঁধে দিলেও আমানতের সুদের বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন দেয়নি। ফলে ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো সুদ দিয়ে আমানত টেনে নিচ্ছে। ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেয়ার উদ্দেশ্যেই হয়তো বেশি সুদে আমানত টানা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।