রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে উপাচার্যের মেয়ে ও জামাতাসহ বিভিন্ন নিয়োগ দেয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকায় উপ-উপাচার্যসহ রাবির আট শিক্ষক-কর্মকর্তার কাছ থেকে কৈফিয়ত চেয়েছে মন্ত্রণালয়। নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার পদ থেকে অধ্যাপক আবদুল বারীকে অব্যাহতি প্রদানের। পাশাপাশি মেয়ে ও জামাতার নিয়োগ কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে উপাচার্যের কাছে। এছাড়া নিয়ম বহির্ভূতভাবে দখলে রাখা ডুপ্লেক্স বাড়ির ভাড়া জরুরি ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাগারে জমা দিতে উপাচার্যকে বলা হয়েছে।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তনের ঘটনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে উপাচার্য ও একজন উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেন রাবির অর্ধশতাধিক শিক্ষক ও কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী সদস্য ড. দিল আফরোজ বেগমকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। ওই কমিটি গত অক্টোবরে তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে জমা দেয়।

ইউজিসির ওই তদন্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহান ও তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা বেশকিছু অভিযোগের সত্যতা মেলে। প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রমাণগুলো তুলে ধরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করে ইউজিসির তদন্ত দল। ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সম্প্রতি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার রাবি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একদিনে ১২টি চিঠি ইস্যু করেছে মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ইউজিসির তদন্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ মেলে। তদন্ত কমিটি বেশকিছু সুপারিশ করেছে। সেসব সুপারিশের আলোকে মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের শোকজ ও নির্দেশনামূলক চিঠি জড়িতদের পাঠানো হয়েছে। জড়িত সবার বিরুদ্ধেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে আলোচিত একটি অভিযোগ ছিল, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিবর্তন করে যোগ্যতা কমিয়ে উপাচার্যের কন্যা ও জামাতাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় উপাচার্যকে দায়ী করে এ বিষয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও অনিয়ম করে দেয়া নিয়োগগুলো বাতিলের সুপারিশ করে ইউজিসি।

সুপারিশটি আমলে নিয়ে রাবি উপাচার্যকে দেয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ শিথিল করে পরিবর্তিত নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান তার মেয়ে সানজানা সোবহান ও জামাতা এটিএম শাহেদ পারভেজকে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। উপাচার্যের এরূপ স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের কারণে দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে ও শিক্ষা-গবেষণার মান নিম্নগামী করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই নিয়োগ কেন বাতিল করা হবে না তার ব্যাখ্যা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রদানের জন্য নির্দেশনা দেয়া হলো।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা সেই নিয়োগ নীতিমালা বাতিলের জন্যও উপাচার্যকে পৃথক একটি চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই চিঠিতে ২০১৭ সালের নিয়োগ নীতিমালা বাতিল করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মেয়ে ও জামাতার নিয়োগের পাশাপাশি রাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নিয়মবহির্ভূতভাবে দখলে রাখার অভিযোগেরও প্রমাণ পায় ইউজিসির তদন্ত দল। অভিযোগটি আমলে নিয়ে ওই বাড়ির ভাড়া বাবদ ৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে উপাচার্যকে।

এদিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নীতিমালা পরিবর্তন করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে উপউপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়াসহ বেশ কয়েক শিক্ষক-কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুল বারী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মজিবুর রহমান, আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গাজী তৌহিদুর রহমান, আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিবলী ইসলাম, ডেপুটি রেজিস্ট্রার সাখাওয়াত হোসেন টুটুল।

এদিকে ইউজিসির তদন্ত কমিটিকে অসহযোগিতা করায় রাবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুল বারীকে রেজিস্ট্রার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য উপাচার্যকে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুল বারী তদন্ত কমিটিকে বিভিন্ন পর্যায়ে অসহযোগিতা করেছে, যা অসদাচরণের শামিল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো সব চিঠিই পাঠানো হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নীলিমা আফরোজের স্বাক্ষরে। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার আলোকে চিঠিগুলো ইস্যু করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো উচ্চ পর্যায় থেকে নেয়া হবে। এ বিষয়ে আমার কোনো ধরনের মন্তব্য করার সুযোগ নেই।