দেশের যেকোনো পর্যায়ের নির্বাচনে অতীতে আমরা দেখেছি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে হস্তক্ষেপ করতে। এটি মাঠ পর্যায় থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দেশের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার এ হস্তক্ষেপ গুরুতর অন্যায় বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার।

শনিবার (১৬ নভেম্বর) বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি) এ সভার আয়োজন করে।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা প্রায় সময়ই শুনি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সংবাদকর্মীসহ নির্বাচনে যুক্তদের নানাভাবে হয়রানি ও নজরদারি চালানো হয়। অতীতে এ ধরনের যেসব কর্মকাণ্ড হয়েছে, সেগুলোর বিচার হওয়া উচিত। এ ধরনের কর্মকাণ্ড যেন আগামীতে না হয় আমরা সে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অতীতে অনেক রকম অন্যায়-অপকর্ম হয়েছে। এগুলো যাতে বন্ধ হয় এবং একটি সুন্দর নির্বাচন ব্যবস্থা যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, একই সঙ্গে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেন শক্ত একটি ভিতের ওপর দাঁড় করানো যায়, সেগুলো আমরা চেষ্টা করব। ভোটের সময় কোটি কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য হয়। রাজনীতি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতি এখন জনকল্যাণ নয়, রাজনীতি এখন ব্যবসা।

সংরক্ষিত নারী আসন প্রসঙ্গে সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, নারী আসনে সরাসরি ভোট হতে পারে। প্রত্যেক আসনে যোগ্য নারীরা ভোটে নির্বাচিত হবেন। রোটেশন অনুযায়ী ভোট হলে দেখা যাবে চারটা নির্বাচনে প্রত্যেক আসনে একজন নারী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। সংরক্ষিত নারী আসন ১০০টা যদি ধরি, ওখানে সরাসরি নির্বাচন হবে। তাহলে সংসদে ৪০০ আসন হবে। এখন সারা দেশে ওই ৪০০ আসনের ১০০টা আসনে কেবল নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে, এক দলের সঙ্গে অন্য দল। অন্য ৩০০ আসনে নারী-পুরুষ সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এভাবে চারটা নির্বাচনে একশ একশ করে পরে সব আসনে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। নাগরিক হিসেবে সবাই সজাগ থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারবিষয়ক কমিশন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, টাকা দিয়ে কর্মকর্তা কেনে, ভোট কেনে, এটা কীভাবে বন্ধ করা যায়। কারণ এটা আর জনকল্যাণ নেই, এটা একটা ব্যবসা। এটা কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেটার পথ বের করতে হবে।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা এ পর্যন্ত ২১টি সভা করেছি। এ সভাগুলোতে আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি। প্রত্যেকটি আইনকানুন, বিধি-বিধান আলোচনা-পর্যালোচনা করেছি। যার ভিত্তিতে সুপারিশ করতে পারব। সাবেক সিইসি মোহাম্মদ আবু হেনার সঙ্গে আলোচনা করেছি। ই-মেইল পেয়েছি তিন শতাধিক, ফেসবুকে ৭০টি, ব্যক্তিগতভাবে হার্ডকপিতে মতামত পেয়েছি। মানুষের সাড়ায় উৎসাহিত হচ্ছি। যাদের মতামত সুস্পষ্ট আছে তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলব। সবার মতামত নিয়ে আমরা সুচিন্তিত একটা সুপারিশ করব। যার ভিত্তিতে সরকার দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবে। নিজের পরিবর্তন করতে হবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে। সংরক্ষিত নারী আসনে ভোট কেমন হবে, ভোটার তালিকা নারী ভোটার কমার কারণ, নির্বাচনী অপরাধ রোধ, সংসদীয় আসনের সীমানা নিয়ে অভিযোগ দূরীকরণ, নির্বাচনী ব্যয় ও পর্যবেক্ষণ, গণমাধ্যমের অবাধ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি, স্থানীয় নির্বাচন কী করে সুষ্ঠু করা হয়, গত তিন নির্বাচনে কী ঘটেছিল এবং তা থেকে উত্তরণের উপায়, মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা ইত্যাদি নিয়ে মতামত নেয়া হবে।

কমিশন সদস্য ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, গত নির্বাচনে কমিশন কত খরচ করল, সেটার হিসাব বের করলাম, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বিরাট টাকা খরচ হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেট ও মাঠ প্রশাসনের পেছনে। পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু প্রয়োগ হয় না। আমরা চাচ্ছি যারা বিদেশে আছেন কেবল তারা নন, যেন যারা দেশে আছেন- অক্ষম, নারী, কর্মস্থলের কারণে যারা এলাকার বাইরে আছেন, তাদের জন্য সুযোগটা রাখতে চাই। যারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন তাদের যেন সুযোগটা নিশ্চিত করা যায় সেটা ভাবা হচ্ছে। এতে একটা বিরাট অসুবিধা হচ্ছে, তাদের আইডি কার্ড নেই। এক্ষেত্রে পাসপোর্টকে আমলে নেয়ার কথা ভাবছি। দলীয় প্রতীক নিয়ে আমাদের এখনো অবস্থান চূড়ান্ত করিনি। তবে মনে হয় দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন হোক সেটা আমরা চাই না। আইনের পরিবর্তন না হলে এটা হবে না।

আরএফইডির সভাপতি একরামুল হক সায়েম বলেন, গণমাধ্যম নীতিমালা সংশোধন করে যেকোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা দূর করে খবর সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি তুলে আনা যেতে পারে।

সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী বলেন, প্রবাসে দেড় কোটি ভোটার রয়েছে। নির্বাচনী দায়িত্ব ও অন্যান্য কারণে ভোটের বাইরে থাকে ৫০ লাখের মতো ভোট। প্রায় দুই কোটি ভোটার বাইরে থাকেন। প্রবাসী তাদেরও পোস্টাল ব্যালটের আওতায় আনা উচিত। সংসদীয় আসন ৪০০ করা। ১০০ আসন হবে নারীদের জন্য। কেন না সংসদীয় ভোটারের ভারসাম্য থাকে না। সব প্রার্থীকে এক মঞ্চে এনে প্রচারের বিষয়টা আইনের মধ্যে আনার প্রতি জোর দেন গোলাম রাব্বানী।

আরএফইডির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীরসহ অন্য সাংবাদিকরাও নারী আসনে সরাসরি ভোট, না ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা, কমিশনের অধীনেই এনআইডি কার্যক্রম রাখা, পেশি শক্তির প্রভাব রোধ, নির্বাচন কমিশনারদের মর্যাদা মন্ত্রীর ওপরে আনা, প্রশাসনের পরিবর্তে ইসি কর্মকর্তাদের ভোটের দায়িত্বে আনাসহ নানা প্রস্তাব করেন।