সারা দেশে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আলাদা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডগুলো তৈরি করা হয়েছে বিআইডব্লিউটিএর ঠিক করে দেয়া সেতুটির উচ্চতা (ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স) অনুযায়ী। নৌ-রুটভেদে বিভিন্ন সেতুর উচ্চতা কত হবে, তা নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে এসব ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডে। তবে সওজ ও এলজিইডির বিরুদ্ধে উঠছে ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড না মেনে সেতু নির্মাণের অভিযোগ।
সওজ ও এলজিইডির ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণীর নৌপথে থাকা সেতুগুলোর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স হবে ১৮ দশমিক ৩ মিটার। দ্বিতীয় শ্রেণীর নৌপথের জন্য ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স ১২ দশমিক ২, তৃতীয় শ্রেণীর নৌপথের জন্য ৭ দশমিক ৬২ ও চতুর্থ শ্রেণীর নৌপথে নির্মাণ করা সেতুর জন্য পাঁচ মিটার ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স রাখার নির্দেশনা রয়েছে। তবে এসব নির্দেশনা ও মানদণ্ড উপেক্ষা করে সেতু নির্মাণ করছে সংস্থা দুটি। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএর জরিপেও বিষয়টি উঠে এসেছে।
শুরুতেই যথাযথ উচ্চতা মানা হয়নি এমন একটি সেতু গোমা। বরিশালের রাঙামাটি নদীতে ২৮৩ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণ করছে সওজ। সেতু নির্মাণের জন্য সওজের যে ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে, সে অনুযায়ী পানির সর্বোচ্চ স্তর থেকে ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স হওয়ার কথা ১২ দশমিক ২ মিটার। কিন্তু সেতুটি মাত্র সাড়ে সাত মিটার ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স অনুযায়ী নির্মাণ শুরু করে সওজ। পরবর্তী সময়ে বিআইডব্লিউটিএর আপত্তির মুখে নকশায় কিছুটা পরিবর্তন করে উচ্চতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার পরও সেতুটির নিচ দিয়ে নৌযান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে কপোতাক্ষ নদের ওপর ১২০ মিটার একটি সেতুর কাজ সম্প্রতি শেষ করেছে সওজ। প্রায় ১৫০ কোটি টাকা খরচ করে বানানো সেতুটির ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স এতটাই কম যে চলতি বর্ষায় নদীর পানি গার্ডারে এসে ঠেকেছে। সম্প্রতি সেতুটি পরিদর্শনে যান বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে তারা দেখতে পান সেতুটি গেজেট অনুযায়ী করা হয়নি।
দেশের কতটি সেতু যথাযথ উচ্চতায় বানানো হয়নি কিংবা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘিত হয়েছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ নিজেদের উদ্যোগে সীমিত পরিসরে একটি জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। ৯৯টি সেতু জরিপ করে মাত্র ১৫টির উচ্চতা যথাযথ পাওয়ার কথা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক। অর্থাৎ ৮৪টি সেতুর ক্ষেত্রেই মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক উচ্চতা মানা হয়নি। এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বলেন, দেশের নৌপথগুলোর মধ্যে হওয়া সেতুগুলোর উচ্চতা কত হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে সওজ, এলজিইডির মতো সংস্থাগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ অনুযায়ীই সেতু নির্মাণ করছে। কিন্তু এক দশক বা তার চেয়ে বেশি সময় আগে যেসব সেতু বানানো হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে উচ্চতার বিষয়টি কোনো সংস্থাই মানেনি। বিআইডব্লিউটিএ দেশের নৌপথে থাকা সেতুগুলো যথাযথ উচ্চতায় রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে একটি সমীক্ষা প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে।
উচ্চতা কম হওয়ায় সম্প্রতি ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে থাকা বছিলা সেতু ভেঙে ফেলার চিন্তা করা হচ্ছে। সেতুটি নতুন করে যথাযথ উচ্চতায় নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। গত ২৮ জুলাই একনেক-পরবর্তী সভা শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, বছিলা সেতুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর ওপর হয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ নদী কিন্তু এখানে এখন বর্ষাকালে কার্গোগুলো আসতে পারে না। ২০০৮ সালে উদ্বোধন করা এ সেতুটি এখন আবার ভাঙার কথা চিন্তা করা হচ্ছে, এটা যথাযথ উঁচু করার জন্য। এটা তো জাতীয় অপচয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পণ্যবাহী নৌকাসহ বিভিন্ন নৌকা যেন চলাচল করতে পারে এমন উঁচু করে সেতু তৈরি করতে হবে। আমাদের জোয়ার-ভাটার দেশ। পানি বাড়ে-কমে। তাই প্রয়োজনে বিআইডব্লিউটিএর অনুমতি নিয়ে এটা (সেতু নির্মাণ) সতর্ক হয়ে করতে হবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বছিলা ব্রিজ ভেঙে ফেলার চিন্তা-ভাবনার কথা বললেও এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন সওজের প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বছিলা সেতু যখন নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন এ নৌরুটটি ছিল তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত। ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ৭ দশমিক ৬২ মিটার ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স রেখে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের পর বিআইডব্লিউটিএ রুটটিকে তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করেছে। এমন অবস্থায় আমাদের পক্ষে তো আর সেতুটি উঁচু করা সম্ভব নয়। আর সওজ কম উচ্চতায় সেতুটি নির্মাণ করছে, এমন অভিযোগও সত্য নয়।
বরিশালের রাঙামাটি নদীতে গোমা সেতু, যশোরে কপোতাক্ষ নদসহ বিভিন্ন সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে উচ্চতায় ছাড় দেয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএর আপত্তির মুখে এরই মধ্যে গোমা সেতুর উচ্চতা বাড়ানো হয়েছে। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের যে মানদণ্ড, সেটা অনুসরণ করেই সারা দেশে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
তবে শুধু সওজ বা এলজিইডিই নয়, কম উচ্চতায় সেতু নির্মাণ করে নৌ চলাচল বিঘ্নিত করার অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিরুদ্ধেও। টঙ্গীতে তুরাগ নদের ওপর নির্মাণাধীন সেতুটির উচ্চতা নিয়ে আপত্তি তুলেছে বিআইডব্লিউটিএ। পরিকল্পনাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে থাকা ১৩টি সেতুর উচ্চতা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি।
কম উচ্চতায় সেতু নির্মাণের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে নৌ চলাচল। এজন্য সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বয় করে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে রেল, সড়ক, নৌ সমান গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর কোনো একটির উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে যদি আরেকটি ক্ষতিগ্রস্ত বা কোনো সম্ভাবনা নষ্ট হয়, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই শঙ্কার। সব সমস্যারই ইঞ্জিনিয়ারিং সলিউশন আছে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে বিরোধে না জড়িয়ে সমন্বয় করে সবচেয়ে ভালো সমাধানে যাওয়া।










