চট্টগ্রামে বৃহৎ ও ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনার একটি বিএম ডিপো গ্যাস বিস্ফোরণ। ২০২২ সালের ৪ জুন রাতে সংঘটিত ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৫১ জন। সরকারি একাধিক সংস্থার পাশাপাশি মালিকপক্ষও তখন ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেয়। এরই মধ্যে কয়েকজন আহত শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। তবে মালিকের নিজ এলাকার শ্রমিক ছাড়া আহত অর্ধশতাধিক এখনো প্রতিশ্রুত নগদ সহায়তা পাননি। 

পটুয়াখালীর মো. অলিউল ইসলাম (৩৬) বিএম ডিপোর জুট ডেস্ক রিসিভার হিসেবে কাজ করতেন। দুর্ঘটনায় তার একটি চোখ, হাত ও পা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা প্রশাসক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুত সহায়তা পেলেও এখনো ডিপো কর্তৃপক্ষের ৪ লাখ টাকার সহায়তা পাননি। এমনকি কর্মহীন এ শ্রমিক নিজের চিকিৎসা করাতে গিয়ে এরই মধ্যে লাখ টাকারও বেশি ব্যয় করেছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটির মালিকের এলাকায় বাড়ি হওয়ায় অলিউলের সহকর্মী আহত ফরমানুল ইসলাম ঠিকই ক্ষতিপূরণের পুরো টাকা পেয়েছেন। 

বিএম কনটেইনার ডিপো, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার আকুতি জানালেও খালি হাতে ফেরত আসতে হচ্ছে বলে দাবি আহত শ্রমিকদের। তারা জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে ৩৬ জন আহত শ্রমিকের তালিকা করা হয়। কিন্তু অজানা কারণে এখনো ১৪ শ্রমিককে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুত সহায়তা দেয়া হয়নি। 

সীতাকুণ্ডের এ দুর্ঘটনায় পেটের ভুঁড়ি বের হয়ে যাওয়ায় মো. কবির বেশ আলোচিত ছিলেন। ভোলা জেলার এই লোড-আনলোড শ্রমিক কাজ করতেন বিএম ডিপোর অভ্যন্তরে দায়িত্বরত মেসার্স মনসুর এন্টারপ্রাইজে। সরকারি দুটি সংস্থার অর্থসহায়তা পেলেও এখন পর্যন্ত বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষের ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি তিনি। একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মনসুরুল আলম নামে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শ্রমিক ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুত সহায়তা পেয়েছেন। 

অলিউর ও কবির ছাড়াও মো. আজিম, মো. নুরুল আফসার, নয়ন বড়ুয়া, মো. নূর হোসেন, মো. আমিরুল ইসলাম, মো. আনোয়ার, মো. জাহাঙ্গীর, মো. মহিউদ্দিন, মো. মিরাজ, মো. মামুন, মো. তারেক ও বিধান দে নামের শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে চিকিৎসা করাতে পারছেন না বলে দাবি করেছেন। বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার দেখা করতে চাইলেও সুযোগ দেয়া হচ্ছে না বলে তাদের অভিযোগ। 

বিএম কনটেইনার ডিপোর অভ্যন্তরে রহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের শ্রমিক নূর হোসেন দিদার চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি। তিনি বণিক বার্তাকে অভিযোগ করে বলেন, ‘বিএম ডিপোর অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা ১৪ জন শ্রমিক এখনো মালিকপক্ষের ক্ষতিপূরণ পাননি। মালিকপক্ষ বাঁশখালীর বাসিন্দা শ্রমিকদের নামে ক্ষতিপূরণ দিলেও চট্টগ্রামের বাইরের কোনো শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও বিএম ডিপোতে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।’ 

বিএম কনটেইনার ডিপোর নির্বাহী পরিচালক মইনুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএম ডিপো বিস্ফোরণে আমরা এরই মধ্যে ২৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছি। নিহত ৫১ জন ছাড়াও দেড় শতাধিক আহত শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। যেসব শ্রমিকের কর্মস্থল ও আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বিলম্ব হয়েছে। আশা করি, কিছুদিনের মধ্যে বাকি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদেরও প্রতিশ্রুত সহায়তার অর্থ দেয়া হবে।’

বিএম ডিপোতে আহত শ্রমিক মো. কবির বণিক বার্তাকে অভিযোগ করে বলেন, ‘আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকলেও বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষ আমাদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। তবে যেসব শ্রমিকের জন্মস্থান চট্টগ্রাম কিংবা বাঁশখালী, তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয়া হলেও অনেক শ্রমিকের ক্ষেত্রে গড়িমসি করছে বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষ।’ ক্ষতিপূরণের জন্য সংগঠিত হয়ে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হলেও মালিকপক্ষ আহত শ্রমিকদের কথা শুনছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। 

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের স্মার্ট গ্রুপের মালিকানাধীন বিএম কনটেইনার ডিপোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন স্মার্ট জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান। চট্টগ্রামভিত্তিক স্মার্ট গ্রুপের কর্ণধার দুই ভাইয়ের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। ফলে ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার ক্ষেত্রেও আঞ্চলিকতার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। বিএম কনটেইনার ডিপোতে আহত শ্রমিকদের একটি অংশ ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে গতকাল মানববন্ধন করেছে চট্টগ্রামে।