ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। লোকসানের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। কেবল দুই মাসেই বেসরকারি খাতের ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্লান্ট (আইপিপি), রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে সরকারের লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকারও বেশি। অব্যাহত এ লোকসানের দায় মেটাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির জোগান দিতে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। ফলে মন্ত্রণালয়টির ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের জন্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ বরাদ্দ দিয়ে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তুকির চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে। বাকি অর্থ নতুন অর্থবছরের বাজেট থেকে সমন্বয় করা হবে।

অর্থ ও বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ—এ দুই মাসে বেসরকারি খাতের আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে সরকারের লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকারও বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তাই ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি-সংক্রান্ত লোকসানসহ এ দুই মাসের জন্য ভর্তুকি দিতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ। এজন্য মোট ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে ভর্তুকি হিসেবে দেয়ার প্রস্তাব সম্প্রতি অর্থ বিভাগে পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

এদিকে চলতি বাজেটে বিদ্যুতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আগের অর্থবছরের মার্চ থেকে চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাসে মোট ৭ হাজার ৯৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ভর্তুকি বাবদ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারির আংশিক ভর্তুকি বাবদ ১ হাজার কোটি টাকা গত রোববার ছাড় করেছে অর্থ বিভাগ। বাকি অর্থ আগামী অর্থবছরের বাজেট থেকে দেয়া হবে। সব মিলিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুতের লোকসান মেটাতে ২০১৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে ৪২ হাজার ৮৫১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ভর্তুকি বাবদ দেয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রাখার স্বার্থে সরকার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান মেটানোর জন্য এ আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ বাজেটে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রতি মাসে ভর্তুকির দাবি আসে। বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা হয় তা দিয়ে তাদের চাহিদা মেটে না। তাই পরবর্তী বাজেটের অর্থ দিয়ে আগের বাজেটের চাহিদা মেটাতে হয়। এবার যে বরাদ্দ রাখা ছিল, তা দিয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়া সম্ভব হয়েছে। পরের চার মাসের ভর্তুকি আগামী বাজেটের বরাদ্দ থেকে দিতে হবে। সারা বছরের আয় ও ব্যয়ে প্রাক্কলন করেই বাজেট প্রণীত হয়। তারপর যদি কোনো খাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় তখন সরকারের ওপর চাপ বাড়ে।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কিনে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সরকারের লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এক্ষেত্রে দ্বিগুণের বেশি লোকসান হয়েছে। এছাড়া রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ কিনে ক্ষতি হয়েছে ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বিদ্যুৎ কিনে লোকসান হয়েছে ২৮৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৩০২ কোটি ২১ লাখ টাকা।

এক বছরের ব্যবধানে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কিনে সরকারের দ্বিগুণ ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে বিপিডিবি চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ত রয়েছেন উল্লেখ করেন। এছাড়া বিপিডিবির সদস্য (প্রশাসন) মো. সাঈদ কুতুব, সদস্য (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) মো. মাহবুবুর রহমান ও সচিব সাইফুল ইসলাম আজাদও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

বিদ্যুতের মাস্টারপ্ল্যান রিভিউ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, সরকারের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প সময়মতো চালু করতে না পারায় রেন্টাল প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। চাহিদার কথা মাথায় রেখেই রেন্টাল প্রকল্পগুলো চালু রাখা হয়েছে। তবে যত দ্রুত সম্ভব অধিকাংশ রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বন্ধ করে দেয়া হবে। নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট ভিত্তিতে দু-একটি গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্র চালু থাকবে।

লোকসান বাড়ার কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১০টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের লোকসান বাবদ ক্ষতি হয়েছে ২৮৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। ৩৭টি ফার্নেস অয়েল, ১৪টি গ্যাস, চারটি সোলার, নয়টি ডিজেলভিত্তিক ও একটি কয়লাভিত্তিকসহ মোট ৬৫টি আইপিপি রয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল ব্যবহার হয়। যার মূল্য গ্যাসের তুলনায় বেশি। তাই লোকসানও বেশি। আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ১১ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে চাহিদা না থাকায় ৯ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট অর্থাৎ সক্ষমতার ৮০ শতাংশ উৎপাদন করেছে তারা। বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়, এটিও ক্ষতি বাড়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গড়ে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ যথাক্রমে ৮ দশমিক ৯৭ ও ৮ দশমিক ৪১ টাকা, সেখানে বিক্রয়মূল্য ৫ দশমিক ১৭ টাকা। আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৪টি কোম্পানির সঙ্গে সরকারের নির্দিষ্ট ক্যাপাসিটি অনুযায়ী মূল্য পরিশোধের চুক্তিসহ তা সময়মতো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেই লোকসান বেড়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি ২০২০-২১ হিসাব বছরের বাজেটে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহূত তেলের ওপর কাস্টমস ডিউটি ও ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এ কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া গত বছরের তুলনায় এ বছর বিদ্যুতের ব্যবহারও কিছুটা বেড়েছে। এতেও সরকারের ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। আর সার্বিকভাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ব্যয় হয়, গ্রাহক পর্যায়ে সরকার এর চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকেই সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে জোর দিচ্ছে সরকার। এতে গত এক দশকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে।যদিও ডিজেলচালিত বেশকিছু বেসরকারি কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। এতে প্রতি বছর বড় অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে বিপিডিবির।

এ প্রসঙ্গে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। যতদিন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলবে, ততদিন লোকসান কমানোর কোনো উপায় নেই। এখন কয়লা বা অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেশকিছু বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প চালু করে তেলভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ করা গেলেই লোকসান কমবে। তিনি আরো বলেন, পায়রার পুরোটা, মাতারবাড়ী ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে পারলেই চার হাজার মেগাওয়াটের মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ চলে আসবে। এগুলোর দাম তেলভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে অনেক কম হবে।

বিদ্যুৎ খাতে ক্রমাগত লোকসানের পেছনে দুটি কারণ মূলত দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, একদিকে বেসরকারি খাতে বিশেষত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো থেকে  উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। আবার প্রত্যাশিত হারে চাহিদা না বাড়ায় বসিয়ে রাখতে হচ্ছে নতুন-পুরনো অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বেসরকারি খাতের ভাড়াভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ। এটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনলে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান অনেক কমে যেত বলে মত বিশেষজ্ঞদের।