সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘গণতন্ত্র অর্জিত হয়ে গিয়েছে বা আর কোনো স্বৈরাচারী সরকারের আবির্ভাব হবে না এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।’

আজ সোমবার (১৮ নভেম্বর) সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের তৃতীয় ও শেষ দিনে আয়োজিত স্পিড টক সেশনে তিনি বলেন, ‘সব মেধাবী ও জ্ঞানীদের অবদানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে নতুন কোনো স্বৈরাচারী আর ফিরে আসতে পারবে না।’

জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ একটি অসাধারণ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতা দখল করে থাকা একটি স্বৈরাচারী সরকারকে ছাত্র ও জনতা মিলে বিতাড়িত করেছে। ইতিহাস ও সাহিত্যের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যেকোনো আন্দোলন বা বিপ্লবের একটি ব্যাকরণ থাকে, আর তা মেনেই সংঘটিত হয়েছে এবারের অভ্যুত্থানটিও।’

বিগত সরকারের বিষয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘যেকোনো স্বৈরাচারী সরকার সাধারণ কিছু যন্ত্র ব্যবহার করে তবে তা দেশভেদে ভিন্ন হয়। আমাদের স্বৈরাচারী সরকারটি ছিল অনেকটা একনায়কতান্ত্রিক। তারা তিনটি উপাদান ব্যবহার করে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল, সেগুলো হলো মিথ্যা, ভয় ও বিকৃতভাবে সাজানো উন্নয়ন।’

ক্ষমতা ধরে রাখার এ উপাদানগুলো কীভাবে কাজ করেছে তা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার সময় দেবপ্রিয় বলেন, ‘মানুষের মনে ভয় সঞ্চারণ করার বড় উপায়গুলো হলো কোনো বিরুদ্ধ মত বা ভিন্নমত প্রতিষ্ঠিত হতে না দেয়া। আর বিগত সরকার তাই নিশ্চিত করেছে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আদর্শকে শোষণ করে ও দমিয়ে রাখার মাধ্যমে। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেই গুম-খুন বা হয়রানির স্বীকার হতে হবে এই ভয় দেখানোর মাধ্যমেই মানুষকে চুপ করিয়ে রাখা হতো।’

সাজানো উন্নয়নের বিভ্রম সাজিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে মূলত অলিগার্কদের উত্থান ঘটানো হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘এক সময় সরকার দেখতে পায় তারা নিজেরাই অলিগার্কদের হাতে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।’

শিক্ষার অবনমন ঘটিয়ে বেসরকারি খাতের অর্থনীতি নষ্ট করার মাধ্যমে শুধু সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহী করা হয়েছে যেন তারা সরকারি চাকরিতে এসে সরকারের সুবিধাভোগী হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে- বলে উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়। তবে তরুণরাই দিন শেষে এ বৈষম্যর বিরুদ্ধে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে উল্লেখ করে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মন্তব্য করেন, ‘সরকারের ক্ষমতা বিস্তার করার জন্য ব্যবহার করা কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে গর্জে উঠেছিল তরুণ ছাত্ররা যা পরবর্তীতে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।’

তবে শুধু অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার পতনের ফলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই বলে সতর্ক করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, ‘আমরা অভ্যুত্থানের ফলে সফল গণতন্ত্র যেমন আসতে দেখেছি তেমনি নতুন স্বৈরাচারের উত্থানও হতে দেখেছি পৃথিবীর ইতিহাসে। একটি স্বৈরাচারী সরকার পতনের ফলেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র অর্জিত হয়ে গিয়েছে বা আরেকটি স্বৈরাচারী সরকারের উত্থান ঘটবে না এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে যেন নতুন কোনো স্বৈরাচার আসার পথ আর তৈরি না হয়।’