পণ্যবাহী জাহাজের ধাক্কায় গত রোববার সন্ধ্যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবে যায় ‘সাবিত আল হাসান’ নামের একটি ছোট লঞ্চ। দুর্ঘটনার পর গতকাল রাত পর্যন্ত ৩৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকজন। এর আগে গত বছরের ২৯ জুন ‘ময়ূর-২’ লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায় মুন্সীগঞ্জ-সদরঘাট রুটে চলাচল করা লঞ্চ মর্নিং বার্ড। ওই ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যু হয়। অন্য নৌযানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এমন ছোট কিংবা বড় নৌ-দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে সবচেয়ে বেশি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে অন্য নৌযানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে।

গত বছরের মর্নিং বার্ড দুর্ঘটনার পাশাপাশি আরো দুটি বড় নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদনে ট্রলার ও নৌকার সংঘর্ষে ১৮ জন ও ৯ সেপ্টেম্বর একই জেলার কলমাকান্দিতে বালুবাহী ট্রলারের ধাক্কায় যাত্রীবাহী ট্রলার ডুবে মারা যান আরো ১২ জন। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে সারা দেশে ৭০টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২১২ জনের। আহত ও নিখোঁজ হন আরো অন্তত ১০০ জন। আরেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব বলছে, ২০১৯ সালে সারা দেশে লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে ১১৬টি। এর মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাক্কার কারণে ডুবে যায় ৪৪টি নৌযান।

অন্যদিকে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে ৬০৮টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২২৪টি ছিল যাত্রীবাহী নৌযান। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ৩ হাজার ৬৩৩ জনের। আর উল্লিখিত সময়ে শুধু লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭৮১ জনের।

‘ডমেস্টিক ফেরি সেফটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক উপস্থাপনায় ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে যাত্রীবাহী লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর। এতে উল্লেখ করা হয়, দেশে ৪৩ শতাংশ লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্য নৌযানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে। লঞ্চ দুর্ঘটনার দ্বিতীয় প্রধান কারণ অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন। মোট দুর্ঘটনার ২৫ শতাংশ ঘটেছে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের কারণে। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৩ শতাংশ, আগুন ও বিস্ফোরণের কারণে ৬ শতাংশ এবং বাকি ৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে লঞ্চের তলা ফেটে গিয়ে। এসবের বাইরে মানবসৃষ্ট ভুল, নৌরুট ও বন্দরের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, যাত্রীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের উপস্থাপনায় আরো বলা হয়, দেশের নৌ-রুটগুলোয় চলাচল করা নৌযানের ফিটনেস সনদ না থাকা, নৌ-চ্যানেলের প্রয়োজনীয় নাব্যতা ও প্রশস্ততা না থাকা, চালকের অদক্ষতা ও অনেক চালকের লাইসেন্স না থাকা, চালকদের নৌযান সংঘর্ষের ঘটনা প্রতিরোধ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকা, বেপরোয়া ও দ্রুতগতিতে চলাচল এবং অন্য নৌযানকে ‘ওভারটেক’ করার প্রবণতায় ধাক্কা লেগে লঞ্চ দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।

রোববারের দুর্ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মাঝনদী দিয়ে চলার সময় মালবাহী জাহাজটি ছোট লঞ্চ ‘সাবিত আল হাসান’কে পেছন থেকে ধাক্কা দিতে দিতে কিছু দূর নিয়ে যায়। একপর্যায়ে লঞ্চটি ডুবে যায়। তবে দুর্ঘটনার জন্য মালবাহী জাহাজ নাকি ছোট লঞ্চটি দায়ী, তা সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি চালকদের অবহেলার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

গত বছর বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য ধাক্কা দেয়া ময়ূর-২ লঞ্চের চালকদের দায়ী করা হয়। নৌ-পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাস্টারের পরিবর্তে ময়ূর-২ লঞ্চটি চালাচ্ছিলেন সুকানি নাসির উদ্দিন মৃধা। তিনি বেপরোয়াভাবে লঞ্চ চালিয়ে ছোট আকৃতির লঞ্চ মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দিয়ে সেটি ডুবিয়ে দেন। একই রকম তথ্য উঠে আসে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তদন্ত প্রতিবেদনেও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে বেশি নৌ-দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় হতাহত হয় নৌযানে নৌযানে ধাক্কা লেগে। তবে এ ধরনের ছোট ছোট ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তেমন গুরুত্ব দেয় না। বড় ঘটনা হলেই কেবল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে।

এ বিষয়ে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছর মর্নিং বার্ড ডুবে যাওয়ার পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। তবে বেশকিছু সুপারিশ প্রকাশিত হয়েছিল। যদি এসব সুপারিশ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হতো তাহলে সাবিত আল হাসান ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটতই না।

অন্যদিকে নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিআইডব্লিউটিএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গতকালের দুর্ঘটনার জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইব্লিউটিএ এবং নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর পৃথকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটির সুপারিশের আলোকে দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে, তার সুপারিশ থাকবে। সেই সুপারিশের আলোকে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।