ঢাকার ধামরাই উপজেলায় প্রায় ৫০০ কুমার পরিবারের বসবাস। পোড়ামাটির তৈরি শিল্পকর্ম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্রই এসব পরিবারের উপার্জনের একমাত্র উৎস। তবে এ উৎস থেকে এখন আর জীবিকানির্বাহ করার মতো আয় আসছে না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মাটির পণ্যের বাজার দখল করে নিয়েছে চীনামাটি, মেলামাইন ও প্লাস্টিকের পণ্যসামগ্রী। ফলে স্বাস্থ্যসম্মত হলেও কমেছে মাটির পণ্যের চাহিদা। করোনার প্রভাবে এ পেশায় জড়িতরা আরো বেশি বিপাকে পড়েছেন। ব্যবসায় তীব্র মন্দায় পরিবারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন উপজেলার মৃৎশিল্পীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধামরাইয়ের চৌহাট ইউনিয়নে ৩০, কুল্লা ইউনিয়নে ২৫০ এবং ধামরাই পৌরসভায় ২০০ পরিবার কুমার পেশায় জড়িত। সে হিসেবে ৪৮০টি পরিবার এ পেশার বংশপরম্পরা ধরে রেখেছেন।

দীর্ঘদিন ধরেই মৃৎশিল্পের বাজারে মন্দাভাব থাকলেও করোনায় তা কয়েক গুণ বেড়েছে। গত এক বছরে এ পেশায় জড়িতরা একরকম বেকার ছিলেন। করোনাকালে নানা উৎস থেকে ঋণ নিয়ে পথে বসার জোগাড় হয়েছে অনেকের। ফলে করোনার প্রভাব কিছুটা কমলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না এ পেশায় জড়িতরা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ঋণ সুবিধার দাবি জানিয়েছে উপজেলার কুমার পরিবারগুলো।

মৃৎশিল্পীরা বলছেন, এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। নেই সরকারি কোনো ঋণের ব্যবস্থাও। ফলে পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় অনেকেই পেশা ছাড়ছেন। তবে যারা পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ পেশায় থেকে যাচ্ছেন, তাদের পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।

ধামরাই পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের পালপাড়া বা কাগুজীপাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ একটি টিনের বাড়ির উঠানে আট-নয়জন মৃৎশিল্পী কাজ করছেন। এর মধ্যে ছয়জন নারী ও তিনজন পুরুষ। ওই বাড়ির মৃৎশিল্পী সন্তোষ পাল (৬০) জানান, সংসারে অভাব অনটনের কারণে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিবার নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে এসে শুরু করেন মৃৎশিল্পের কাজ। বাবা, স্ত্রী, তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তান নিয়ে তার সংসার। তিন কন্যাকেই বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।

সন্তোষ পাল জানান, করোনার আগে কোনো এক বায়ারের মাধ্যমে তার উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রেও গিয়েছে। প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মাটির কাপ ও অন্যান্য পণ্যের অর্ডার থাকে।

আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার পরে বাপ-দাদার এ ব্যবসা ধরে রাখার মতো আমার পরিবারে আর কেউ থাকবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চাহিদা থাকলেও এ ব্যবসায় সামাজিক মর্যাদা এবং আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। নেই কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা।

করোনাকালীন সরকারি-বেসরকারি সহায়তার মধ্যে কেবল পৌরসভার মেয়রের পক্ষ থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট, এক প্যাকেট চা-পাতা এবং ১০০ গ্রাম মুড়ি পেয়েছিলেন সন্তোষ। আক্ষেপ থাকলেও পেশা বদলাননি তিনি। চেষ্টা করছেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর। সেজন্য প্রত্যাশা করেছেন সংশ্লিষ্টদের যথাযথ সহযোগিতা।

উপজেলার কুমাররা বলেন, মৃতশিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হয় এঁটেল মাটি। এক ট্রাক মাটির মূল্য ৪-৭ হাজার টাকা। এক সময় সবকিছুই সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি হতো, সময়ের বিবর্তনে মাটির জিনিসপত্র তৈরিতে ‘বল প্রেস মেশিন’ ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি মেশিনের দাম ১৬-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। শ্রমিকদের মজুরি দিনপ্রতি ৪০০-৬০০ টাকা। আছে পোড়ানোর খরচও। এতে সারা মাসে সব খরচ বাদে সামান্য কিছু আয় থাকে।

কুমাররা আরো বলেন, মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে তন্দুরি চায়ের জন্য মাটির তৈরি কাপের বেশ চাহিদা বেড়েছে। সেই সঙ্গে ফিন্নির বাটি, দইয়ের কাপ ও পাতিলেরও কাটতি আছে বাজারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মৃৎশিল্প সম্ভাবনাময় একটি খাত। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে দেশের পাশাপাশি দেশের বাইরেও এ খাতের বড় বাজার তৈরি সম্ভব।

এ মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কোনো ধরনের পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামিউল হক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বরাত দিয়ে বলেন, আমরা চাইলেই গণমাধ্যমকে বক্তব্য দিতে পারি না।