চট্টগ্রাম নগরীতে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিত করতে ১৯৬৩ সালে ওয়াসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে এ ছয় দশকেও সংস্থাটি ৩২ লাখ নগরবাসীর জন্য পরিকল্পিত কোনো পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি বড় কোনো প্রকল্পও গ্রহণ করেনি। এখন হঠাৎ করেই হাতে নেয়া হয়েছে ছয়টি বড় প্রকল্প, তাও আবার একই সময়ে। ফলে এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্প পরিচালনায় চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা রয়েছে কিনা সে প্রশ্নও উঠছে। কেননা সংস্থাটি ঠিকমতো পানি সরবরাহের কাজটি সামলাতেই ব্যর্থ হয়েছে।
পরিকল্পিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়তে ২০১৭ সালে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা, যেখানে চার দশকে এ খাতে ২৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সে পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ছয়টি ভাগে ভাগ করে তা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। প্রাথমিকভাবে সরকারি অর্থায়নে ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়। কিন্তু সময়মতো ঠিকাদার নিয়োগ না দেয়া, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সঙ্গে বিরোধের জেরে কাজটি এগোচ্ছে না। এর মধ্যেই আবার আরো পাঁচটি পয়েন্টে একই ধরনের প্রকল্প নেয়াকে অবিবেচক সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের ভাষ্যমতে, চট্টগ্রাম ওয়াসার মতো ‘অথর্ব’ প্রতিষ্ঠানকে এতগুলো বড় প্রকল্পের কাজ একসঙ্গে দেয়া হলে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি হবে। কারণ সংস্থাটি তাদের মূল দায়িত্বই ঠিকমতো পালন করতে পারছে না।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ছয়টি পৃথক ক্যাচমেন্টে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগে রয়েছে একটি করে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা। একই সঙ্গে নির্মাণ করা হবে দুটি পয়ঃশোধনাগার। এর মধ্যে হালিশহর এলাকায় ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পটি চলমান। ২ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তর কাট্টলী এলাকায় আরেকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কালুরঘাট ও পূর্ব বাকলিয়া এলাকায় দুটি ক্যাচমেন্ট প্রকল্পের জন্য জাপানের সহায়তায় সমীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে কালুরঘাট ক্যাচমেন্টের ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন।
ফতেহাবাদ এলাকায় ক্যাচমেন্ট স্থাপনের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় সমীক্ষা করা হয়েছে। এখন সেই দেশটির একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই প্রকল্পের কাজটি করার চেষ্টা চলছে। একইভাবে ৬ নম্বর ক্যাচমেন্ট এলাকা হিসেবে আরেকটি প্রকল্প হবে পতেঙ্গা এলাকায়। এটিও জাপানি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পিপিপির মাধ্যমে করার চিন্তা চট্টগ্রাম ওয়াসার। অর্থাৎ ছয় এলাকায় একই সময়ে পৃথক প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এতে তিন প্রকল্পের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১১ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা। বাকি তিনটি প্রকল্প মিলিয়ে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী মোট ২৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন। কিন্তু ডলারের রেট বেড়ে যাওয়ায় এখন আরো বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার উন্নয়ন বিভাগের উপপ্রধান মোহাম্মদ মাহাবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৭ সালে যখন মাস্টারপ্ল্যান করা হয় তখন ডলারের যে রেট ছিল এখন তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশী যন্ত্রপাতি আমদানি এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে হয়, যার লেনদেন করতে হবে ডলারে। তাই নিশ্চিতভাবে আরো বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।’
এদিকে প্রকল্প গ্রহণের সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী পর্যায়ভিত্তিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে একটি শেষ করে অন্যটি গ্রহণ করতে হয়। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তীটি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে পরিপত্রের ৩ নং অনুচ্ছেদে। যদিও চট্টগ্রামের পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পগুলোয় এ নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি পরিপত্রে স্পষ্ট বলা আছে, প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প শেষ হলে তা মূল্যায়ন করতে হবে। এ মূল্যায়ন প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তী পর্যায়ের প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। বেশ কয়েকটি ধাপ পার হয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়ে থাকে। তাই প্রকল্প যাচাইয়ের সময় পরিপত্র অনুসরণ করা হয়েছে কিনা সেটা দেখা উচিত।’
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রথম প্রকল্পটির মাধ্যমে বন্দরনগরীর হালিশহর এলাকার ২০ লাখ মানুষকে পয়োনিষ্কাশনের আওতায় আনতে দৈনিক ১০ কোটি লিটারক্ষমতার একটি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ কার্যক্রম চলছে। দৈনিক ৩০০ ঘনমিটারক্ষমতার একটি ফিকেল স্ল্যাজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণেরও কথা রয়েছে। স্থাপন করা হবে ২০০ কিলোমিটার পাইপলাইন। এ প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে ২০১৮ সালে। গত বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।
এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি কেবল ৩২ শতাংশ। এ অবস্থায় মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে ব্যয়ও ১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়াবে ৪ হাজার ৯০৭ কোটি টাকায়। কিন্তু সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে ডলারের দর ৯৫ টাকা ধরায় সেটি গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত একনেক সভা থেকে ফেরত দেয়া হয়েছে। কারণ ডলারের দাম বাজারমূল্যে হিসাব না করলে আবারো প্রকল্প সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
পরিকল্পনা সচিব সত্যজিৎ কর্মকার এ বিষয়ে বলেন, ‘মূলত ডলারের দর নির্ধারণ ঠিক না হওয়ায় এটি ফেরত দেয়া হয়েছে। এখানে দায়িত্বে অবহেলার কোনো বিষয় নেই। ভবিষ্যতে দর ঠিক করার পর এটি পুনরায় একনেক সভায় উত্থাপন করা হবে।’
প্রথম প্রকল্পটি ঠিকমতো করতে না পারলেও দ্বিতীয় আরেকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মাধ্যমে উত্তর কাট্টলী এলাকায় তিন লাখ মানুষের জন্য দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার পয়োবর্জ্য শোধনাগারের সাহায্যে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে। ৯৮ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে এ নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে ৮ হাজার ১০০ বাড়িকে। যদিও নিজস্ব জমিতে ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণে ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ভূমির ক্ষতিপূরণ দাবি করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
তৃতীয় আরেকটি প্রকল্প নেয় হচ্ছে কালুরঘাট এলাকায়। এ ক্যাচমেন্টের ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর অনুমোদনের পর থেকে মেয়াদ ধরা হয়েছে আট বছর। বাকিগুলোও সমীক্ষা শেষ করে এখন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির পর্যায়ে রয়েছে।
এতগুলো প্রকল্প একসঙ্গে নেয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্য প্রকল্পগুলো বিদেশী অর্থায়নে করার কথা বলা হচ্ছে। এখন বিদেশী অর্থায়ন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করেই অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
এদিকে ৬০ বছরেও পয়োনিষ্কাশন নিয়ে কোনো কাজ না হওয়াটা চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওয়াসা নামের মধ্যে যে দুটি প্রধান কাজ নিহিত তার একটি পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা। কিন্তু ৬০ বছর এটা নিয়ে কোনো কাজ না করা মানে জনস্বাস্থ্য নিয়ে তাদের কোনো চিন্তাই ছিল না।’
একসঙ্গে কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘ঠিকমতো পানি সরবরাহ করতে পারে না চট্টগ্রাম ওয়াসা। এমন অথর্ব প্রতিষ্ঠানকে এতগুলো প্রকল্প দিলে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি হবে। প্রকল্প শাসিত ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। যেখানে প্রকল্প গ্রহণের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে সংস্থাগুলো। আর এসব প্রকল্পে ব্যবহৃত বিদেশী ঋণগুলো একসময় বোঝায় পরিণত হবে।’
তবে একসঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখছেন না চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিদেশী এজেন্সির মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আলাদা প্রকল্প পরিচালক থাকবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করে কাজ আগানো হবে। এসব কাজ কঠিন মনে করলেই কঠিন।’










