স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতি থেমে ছিল না কভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও। গত বছর করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পিপিই-মাস্কসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় অন্তত ৭২১ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটতে দেয়া এসব ক্রয়াদেশের বিপরীতে পণ্যসামগ্রী সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অর্থ পেতে চাপ দিচ্ছে সিএমএসডিকে। সম্প্রতি এর সমাধান চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের চিঠিতে বলা হয়, কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার প্রাথমিক অবস্থায়ই স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিএমএসডি বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনেছে। গত বছরের ৩ জুন সিএমএসডির বর্তমান পরিচালক দায়িত্ব নেয়ার আগে পর্যন্ত সে সময়ের পরিচালক ১ হাজার ২৮৫ কোটি ২২ লাখ ৪১ হাজার টাকা প্রাক্কলিত মূল্যে ১৯৬টি প্যাকেজের আওতায় বিভিন্ন কভিড-১৯ সামগ্রী কেনার পরিকল্পনা নেন। এর মধ্যে ৩৪৪ কোটি ১১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে ৫৭টি প্যাকেজের দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠানো হয়। আর ৫ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে দুটি প্যাকেজের দরপত্র মূল্যায়নের জন্য পাঠানোও হয়নি।

অন্যদিকে ৩৭১ কোটি ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রাক্কলিত মূল্যের ৫৮টি প্যাকেজের দর প্রস্তাব পাওয়া গেলেও সেগুলোর দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়নি। এর পরও এসব প্যাকেজের আওতায় কোনো কোনো মালামাল আংশিক বা সম্পূর্ণ সরবরাহ করা হয়েছে। চিঠির তথ্য অনুযায়ী সর্বমোট ৭২০ কোটি ৭৫ লাখ ৫৭ হাজার টাকা মূল্যের সুরক্ষা সামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এমনকি এসব পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে বরাদ্দের জন্য সম্মতিও চাওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোর পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রায় ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তত্কালীন পরিচালক। এর মধ্যে কিছু সরঞ্জাম কেনা হলেও সেগুলোর ক্রয় প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল। ত্রুটির বিষয়গুলো উল্লেখ করে সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দেয়া হয়েছে। এসব কেনাকাটায় আগে থেকে অর্থ বরাদ্দও চাওয়া হয়নি। ফলে সেগুলোর বিপরীতে কোনো বরাদ্দও নেই। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহ করেছে তারা এখন অর্থ চাইছে। আবার ক্রয় প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকায় নতুন করে বরাদ্দও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

কেনাকাটায় অনিয়মের কথা বলা হলেও চিঠিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। বণিক বার্তার পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাওয়া হলেও রাজি হননি সিএমএসডি পরিচালক। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি যে ১৪টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে, তাদের কাছ থেকে কোনো পণ্য সরবরাহ নেয়া হচ্ছে না বলেও তিনি জানান।

সিএমএসডির চিঠিতে বলা হয়, পিপিআর-২০০৮ অনুসারে সরকারি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) প্রাথমিক প্রক্রিয়া যেমন- ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান কর্তৃক ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন, আনুষ্ঠানিক দর কষাকষি, দরপত্র বা প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভা করা এসব অনুসরণ করা হয়নি। বিপুল অংকের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকলেও পিপিআরের বিধান অনুসরণ করে আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ অনুযায়ী প্রযোজ্য যথাযথ ক্রয় অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও গ্রহণ করা হয়নি।

চিঠিতে আরো বলা হয়, চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে সে সময় কোনো নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করা হয়নি। কার্য সম্পাদন জামানত গ্রহণ করা হয়নি। কোনো সরবরাহ চুক্তি সম্পাদন করা হয়নি। এমনকি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন ও চুক্তি স্বাক্ষর ব্যতীত সরবরাহ আদেশগুলোও বিধিসম্মত হয়নি। সরবরাহ আদেশে সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সামগ্রীর পরিমাণ উল্লেখ করা হলেও নির্ধারিত কোনো একক মূল্য ও মোট মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। এসব কেনাকাটায় কোনো শর্তাবলি যুক্ত করা হয়নি। এসব কার্যাদেশের বিপরীতে অনেক ক্ষেত্রে জরিপ ছাড়াই বিভিন্ন পণ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রয় কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য তখন কোনো বাজেট বরাদ্দও নিশ্চিত করা হয়নি।

জানা গেছে, সরঞ্জাম ক্রয়ের বিপরীতে বিল পরিশোধের বিষয়ে নির্দেশনার জন্য গত জুনে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে পাঠানো এসব প্রস্তাবে নানা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকায় সেগুলোর তদন্ত করছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তবে এখনো এ-সংক্রান্ত বিষয়ে সিএমএসডিকে কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, সিএমএসডির চিঠিটি হয়তো আমাদের মন্ত্রণালয়ে এসেছে। তবে এখনো আমার হাতে আসেনি। সেটি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সিএমএসডি সূত্রে জানা গেছে, জরুরি পরিস্থিতিতে কেনাকাটায় এসব পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে তখন কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। সে সময়ে মালামাল সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন বিল দাবি করছে। তারা বিভিন্ন উৎস থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে সিএমএসডির ওপর তাদের বিল পরিশোধের জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছেন। এ বিষয়ে সিএমএসডির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঝে মাঝেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটছে। এমনকি তারা বিল দাবি করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে আবেদন করলে সেগুলোও সিএমএসডিতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। বর্তমান সিএমএসডি ব্যবস্থাপনা গত বছরের ৩ জুন থেকে সর্বমহল স্বীকৃতভাবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এলেও আগের ব্যবস্থাপনার ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার কারণে সিএমএসডির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এটা আমরা আগেও বলেছি। এবার সিএমএসডি নিজে থেকে যখন অনিয়মের কথা বলছে, তার মানে আমাদের বক্তব্যকেই প্রত্যয়ন করা হলো। আমি মনে করি, সিএমএসডির এ পর্যবেক্ষণই শেষ নয়, এটা শুরু মাত্র।