জলবায়ুজনিত নানা সংকট ও দুর্যোগের কারণে অনেক সময় কৃষক উৎপাদিত ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। ফলে বিনিয়োগ করা অর্থও ফেরত আসে না। বিপরীতে গরু-ছাগল পালন, দুধ ও পোলট্রি উৎপাদন থেকে তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক আয়ের ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশই আসে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ধারাবাহিক লোকসানে ক্ষুদ্র কৃষকদের অনেকে ফসল চাষ কমিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। এতে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী মানুষের ভিড় বাড়ছে এবং ফসলের মৌসুমে শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে। ফসল চাষে মুনাফা নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষুদ্র কৃষকের বড় অংশ ধীরে ধীরে আবাদ কমিয়ে বিকল্প পেশা বা পশুপালনের দিকে ঝুঁকবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদে সরকারকে নীতিপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘আ স্টাডি অন ভ্যালু চেইন এফিশিয়েন্সি অব দি এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় ধান/চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম ও ব্রয়লার মুরগি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, কৃষক বা উৎপাদকরাই সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ঝুঁকি বহন করেন। উৎপাদন খরচ, সরবরাহ, চাহিদা, বাজারদর ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর তাদের আয় অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান। এটি উৎপাদনে জমি প্রস্তুত, শ্রম, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও যন্ত্রপাতিতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। চলতি বছরের বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। মাঠপর্যায়ে কৃষকসেবায় নিয়োজিত সংস্থাটির হিসাবে, এবার প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের নিট ব্যয় হয়েছে ৩৪ দশমিক ১১ টাকা। প্রতি একরে এ ব্যয় ৯৯ হাজার ৯০ টাকা। বিপরীতে এক একর জমির ধান বিক্রি করে কৃষক পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৮০৩ টাকা। অর্থাৎ ধান বিক্রির আয় নিট ব্যয়ের চেয়েও কম। তবে খড়ের মূল্য ১০ হাজার ৪০০ টাকা ধরলে কৃষকের মুনাফা হয়। খড়ের আয় বাদ দিলে ধান বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ কৃষকের মোট ব্যয়ের চেয়েও কম থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের গবেষণায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যয় কেজিপ্রতি ৫৪ টাকা বলা হয়েছে। বিপরীতে এর গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ৪১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে গড়ে ১৩ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে।
আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ; চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বরং বেশি। এ অতিরিক্ত উৎপাদন কৃষকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই বছরে লোকসান গুনে অনেক আলুচাষী নিঃস্ব হয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৫ সালে জেলায় ডায়মন্ড জাতের আলু উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় ছিল কেজিপ্রতি ১৬ টাকা ৬৫ পয়সা। অথচ কৃষক তা বিক্রি করেছেন কেজিপ্রতি ১৪ টাকায়। এক একর জমিতে আলু চাষে কৃষকের ব্যয় হয় ২ লাখ ৯ হাজার ৯৭৪ টাকা; বিপরীতে বিক্রি করে পান ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৮ টাকা। অর্থাৎ একরপ্রতি লোকসান হয় ৩৪ হাজার ৪৭৬ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ব্যয় যোগ হলে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়ে। চলতি বছরও আলুতে লোকসান গুনছেন কৃষক।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আলু উৎপাদনে কৃষকের কেজিপ্রতি ব্যয় ছিল ১৪ থেকে ১৬ টাকা। হিমাগার ভাড়া, পরিবহন, বস্তা ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে তা প্রায় ২৫ টাকায় পৌঁছায়। অথচ কৃষক হিমাগার গেটে আলু বিক্রি করছেন কেজিপ্রতি ১৫-১৮ টাকায়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ধান। বিশেষ করে বোরো ধানের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি ২০১৭-১৮ সালের দিকে এ নিয়ে তিন দফা জরিপ করেছিল। তাদের গবেষণায় বোরো ধানের নিট রিটার্ন নেগেটিভ পাওয়া গিয়েছিল। এখন কৃষি ক্রমেই বাণিজ্যিক হচ্ছে। আগের মতো শুধু নিজের খাওয়ার জন্য চাষ করার অবস্থায় কৃষক নেই। খাবার কিনে খাওয়া ঘিরে যে সামাজিক সংকোচ ছিল, সেটিও কমে গেছে। ফলে কৃষক মুনাফার হিসাব করেই চাষ করছেন। বিষয়টি হয়তো এখনো বড় আকার নেয়নি, তবে এ প্রবণতা বাড়ছে। কৃষক যখন দেখবেন মুনাফা হচ্ছে না, তখন তিনি ওই ফসলের চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। পরিবর্তনটি রাতারাতি হবে না। যেমন, যিনি আগে ১০ বিঘা জমিতে চাষ করতেন, তিনি হয়তো আট বা নয় বিঘায় নেমে আসবেন। এভাবেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ময়মনসিংহে গবেষণার কাজ করার সময় দেখেছি অনেক কৃষক ধান চাষ বাদ দিয়ে বাগান করেছেন। কারণ ফসলের চেয়ে বাগানে মুনাফা বেশি। এ রকম সামান্য পরিবর্তন হচ্ছে। যদিও জমির শ্রেণীর কারণে মুনাফা না হওয়ার পরও অনেক কৃষক ধান চাষ করেন। সেগুলো হয়তো সবসময় থাকবে, কিন্তু বিকল্প সুযোগ থাকলে সে এসব থেকে সরে যেতে পারে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদক তথা ক্ষুদ্র কৃষকের আয়ের ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশই আসে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে। তবে এ খাত থেকে তাদের বার্ষিক গড় আয় মাত্র ২৮ হাজার ৪২১ টাকা। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবাদিপশু পালনে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না সে অনুপাতে। ক্ষুদ্র কৃষকদের বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতাও দুর্বল। ফলে তারা উৎপাদিত মাংস, দুধ ও ডিমের ন্যায্যমূল্য পান না। এর সঙ্গে রোগবালাই ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি, স্বল্পসুদে ঋণের সীমিত সুযোগ এবং মানসম্মত প্রযুক্তিসেবার অভাবে তাদের নিট মুনাফা কমছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণিসম্পদে বিভিন্নভাবে আয় বাড়ার সুযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, একটি দুগ্ধ খামারে প্রতিটি গাভীর জন্য দৈনিক ব্যয় ৪৮৭ দশমিক ৮৩ টাকা। অথচ দুধ থেকে মোট রিটার্ন ১ হাজার ৯৯ টাকা পাওয়া যায়। ব্যয় বাদ দেয়ার পর নিট রিটার্ন ছিল প্রায় ৫৯৪ টাকা। অর্থাৎ ওই গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, একটি গাভী থেকে দিনে প্রায় ৫৯৪ টাকা নিট রিটার্ন পাওয়া গেছে। যদিও এ ফলাফল সব খামারের জন্য প্রযোজ্য নয়। কেননা গাভীর জাত, দুধ উৎপাদন, খাদ্যের দাম, শ্রম, চিকিৎসা, বাজারদর ও খামারের ব্যবস্থাপনার ওপর প্রকৃত আয় নির্ভর করবে।
আরেক গবেষণায় বলা হয়, প্রাণিসম্পদে শুধু একটি পণ্য থেকে আয় হয় না। গাভী থেকে দুধের পাশাপাশি বাছুর পাওয়া যায় এবং গোবর জৈবসার হিসেবে ব্যবহার বা বিক্রি করা যায়। ফলে কৃষকের কাছে প্রাণিসম্পদ শুধু একটি পণ্য উৎপাদনের ব্যবসা নয়; একই উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে দুধ, বাছুর ও গোবর—একাধিক ধরনের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে ধান বা আলুর ক্ষেত্রে সাধারণত একটি উৎপাদন মৌসুম শেষে ফসল বিক্রি করে আয় করতে হয়। ফলে কৃষকের টাকা বিনিয়োগ করার পর আয় ফেরত পেতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। বিপরীতে পোলট্রি খাতে দ্রুত উৎপাদন ও বিক্রির সুযোগ থাকায় মুনাফার সুযোগ বেশি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রচলিত কৃষিতে কৃষকের মুনাফা কম। জমির পরিমাণ কম, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত এবং উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় তাদের লাভ কমে যায়। এজন্য কৃষিজমি একীভূত করে সমবায়ভিত্তিক কৃষি একটি ভালো সমাধান হতে পারে। অন্যদিকে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে তুলনামূলক কম জায়গা লাগে। ফলে অল্প জমির মালিকও বাড়িতে এসব পালন করে লাভবান হতে পারেন। বাড়িতে পালন করা হাঁস-মুরগি অনেক সময় চরে খাবার খায়, তাই উৎপাদন ব্যয়ও কম থাকে। তবে বাণিজ্যিক খামারিরা খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের উচ্চমূল্যের কারণে এখন আর তেমন সুবিধা করতে পারছেন না। গ্রামীণ কৃষক বাড়িতে গরু পালন করেন এবং প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবহার করায় তাদের ব্যয় কমে; ফলে মুনাফা তুলনামূলক বেশি থাকে।’
সরকার কৃষিতে কৃষকের ব্যয় কমাতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষকের মূল ব্যয় সার, শ্রমিক ও সেচে। এ জায়গাগুলোয় আমরা কাজ করছি। আমরা জরিপ করেছি। মাটি নিয়ে কাজ করছি। এর মাধ্যমে কৃষকের ২৩-২৭ শতাংশ সার ব্যবহার কমে আসবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকের ব্যয় কমাতে মেকানাইজেশনে যাব। কৃষক মেশিন ব্যবহার করে ধান লাগাবে, কাটবে, এতে তার ব্যয় কমে আসবে। তৃতীয়ত, সেচের ব্যয় কমাতে আমরা ডিপ টিউবওয়েলকে সোলারে কনভার্ট করছি। কয়েক হাজার সোলারে কনভার্ট হয়েছে। আগামী বছর ৬০-৭০ হাজার ডিপ টিউবওয়েলকে সোলারে কনভার্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কৃষকের সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেল খরচ বেঁচে যাবে। আমরা তার উৎপাদন ব্যয় কমাতে কাজ করছি।’










