নির্ভরযোগ্য, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশের শিল্পখাত আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মহানগর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি সিমিন রহমান। তার মতে, এতে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর আরো দ্রুত হবে।
বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে তিনি এসব কথা বলেন। কনক্লেভটির আয়োজন করে বণিক বার্তা।
সিমিন রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে টেকসই শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তার মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু অবকাঠামোর বিষয় নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিল্পখাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু জ্বালানির প্রাপ্যতা নয়, বরং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং বিদ্যুতের মান নিশ্চিত করা। বিদ্যুতের ঘাটতি, ভোল্টেজের ওঠানামা এবং হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তিনি আরো বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় জেনারেটর চালানো, কাঁচামাল পরিবহন এবং প্রস্তুত পণ্য বাজারজাত করার ব্যয়ও বেড়েছে। তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এ অতিরিক্ত ব্যয় পুরোপুরি ভোক্তার ওপর চাপাতে পারে না। ফলে তাদের নিজেদেরই বড় অংশ বহন করতে হয়। এতে লাভ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও নতুন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার মতে, এ সমস্যা এখন প্রায় সব উৎপাদনমুখী শিল্পের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের উদাহরণ দিয়ে সিমিন রহমান বলেন, এ খাতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি শুধু উৎপাদনের জন্য নয়, পণ্যের মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস আন্তর্জাতিক উৎপাদন মান অনুসরণ করে জীবাণুমুক্ত ইনজেকশন উৎপাদন করে। সেখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুচাপ, বিশেষ বায়ুপ্রবাহ এবং পরিবেশগত অবস্থা সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ভোল্টেজের অস্থিরতায় এ ব্যবস্থা নষ্ট হতে পারে। এতে আধুনিক উৎপাদন যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন আবার শুরু করার আগে দীর্ঘ মান যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তার মতে, এ শিল্পে এটি শুধু উৎপাদন বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়, বরং পণ্যের মান এবং রোগীর নিরাপত্তার প্রশ্ন।
তিনি বলেন, ক্যানসারের ওষুধ বা ইনসুলিনের মতো উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের একটি ব্যাচের মূল্য কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও পুরো ব্যাচকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এতে রফতানি বিলম্বিত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সিমিন রহমান বলেন, জাতীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের অর্থে অতিরিক্ত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হচ্ছে। অথচ এ অর্থ গবেষণা, উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করা গেলে শিল্পখাত আরো দ্রুত এগিয়ে যেতে পারত।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যেসব দেশ জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য এনেছে এবং জ্বালানি ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে, তারা বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হয়েছে।
সিমিন রহমানের মতে, বাংলাদেশেরও একই পথে এগোনোর সুযোগ রয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং জাতীয় গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা ও বিদ্যুতের মান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে এমন নীতিগত পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ আরো বাড়ে।
তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু জ্বালানি খাতের বিষয় নয়। এটি বিনিয়োগ, রফতানি, জনস্বাস্থ্য এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।










