শিল্পাঞ্চল খ্যাত নারায়ণগঞ্জের জনসংখ্যা ২৯ লাখ ৪৮ হাজার ২১৭। রাজধানীর কাছের এ জেলা শহরে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে দুটি। একটি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট, অন্যটি ৩০০ শয্যার। শহরের বি বি রোডে অবস্থিত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টেরিয়া) ২০২৩ সালের নভেম্বরে ১০ শয্যার অত্যাধুনিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) অর্থাৎ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালু করা হয়। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও জনবল সংকটে প্রায় নয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে জরুরি এ ইউনিট।

রোগী ও তার স্বজনরা বলছেন, আইসিইউ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীরা। সংকটাপন্ন রোগীদের পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেকে আইসিইউ চালু করার জন্য টেকনিশিয়ান ও চিকিৎসক নিয়োগ দেয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। দ্রুতই চালু হবে আইসিইউ ইউনিট।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শহরের বি বি রোডে ১৯৩৮ সালে নির্মাণ করা হয় জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া)। ৩০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি ১৯৫৭ সালে ৬৫ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৫৮ জন। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ জন। আর ৪৫ হাজার ৬৬৮ জন আন্তঃবিভাগে ভর্তি হয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে ৮ হাজার ৫৩১টি অপারেশন হয়েছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত দেওভোগ এলাকার সালমান জানান, চারদিন আগে তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ঢাকায় রেফার করে।

আইসিইউ বন্ধের কারণে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়েছে। আইসিইউ বন্ধের কারণে গুরুতর ডেঙ্গু রোগীদের ঢাকা পাঠানো হচ্ছে। আইসিইউ থাকলে ২৪ ঘণ্টা কনসালট্যান্ট ডাক্তার পাওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু এটি বন্ধ থাকার কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগীদের।’

তিনি বলেন, ‘১০ শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটি চালু হওয়ার এক বছর পরই বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে হাসপাতাল থেকে পুনরায় আইসিইউ ওয়ার্ড চালু করার জন্য আবেদন করা হয়েছে।’

নগরবাসী বলছেন, শিল্পাঞ্চল খ্যাত নারায়ণগঞ্জ চিকিৎসাসেবায় অনেক পিছিয়ে। এখানে সরকারি দুটি হাসপাতাল থাকলেও নানা সংকটে বেশির ভাগ রোগীকেই রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রায় সময় আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা রোগীর জীবন সংকটে পড়ে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ। বিশেষ করে আইসিইউ সেবার কথা বলা হলেই রোগীদের বাড়তি খরচে নিতে হয় বেসরকারি হাসপাতালে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট চালু করা হয়। হাসপাতালের চতুর্থ তলায় নির্মিত আইসিইউতে রোগীদের সেবা ভালোই চলছিল। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় চিকিৎসক, নার্স, কনসালট্যান্ট ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এরপর নতুন করে আর জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সির্ভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহম্মদ মুশিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ১০ শয্যাবিশিষ্ট আইসিইউ ইউনিটটি ছিল ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতাধীন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স, কনসালট্যান্ট ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এ কারণে আইসিইউ ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা আমাদের জনবল দিয়ে চালু রাখার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি আইসিইউ ইউনিট চালুর জন্য।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুত নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ১০ শয্যাবিশিষ্ট নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটি চালু করা হবে। মানুষের সেবা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ।’