দেশে হামের উপসর্গে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে মোট প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯৯-এ। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৯৯ জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে ১০০ জন মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশে গত চার বছরে হামে কোনো মৃত্যুর রেকর্ড নেই। চলতি বছর মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রাণ হারাল প্রায় এক হাজার শিশু। হামে মৃতের সংখ্যা হাজার ছুঁইছুঁই হলেও আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশ এখনো ‘সন্দেহজনক’ হিসেবেই রয়ে গেছে। রোগীর শরীরে উপসর্গ স্পষ্ট থাকার পরও পর্যাপ্ত পরীক্ষা না হওয়ায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হচ্ছে কম সংখ্যক রোগীর। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ১০০ হলেও উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯৯-এ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৫৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আর এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৭৯ জনের শরীরে।
এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৫-এ। বিপরীতে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১-এ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা কম দেখাচ্ছে। দেশে সীমিতসংখ্যক স্থানে হাম শনাক্তের পরীক্ষা হচ্ছে। দৈনিক পরীক্ষার সক্ষমতাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সরকারি হিসাবে নিশ্চিত হাম রোগী ও মৃতের সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ‘হামে মারা যাওয়া এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া—দুই ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রেই অনেক রোগী প্রকৃতপক্ষে হাম আক্রান্ত ছিল। দেশে একটি সীমিত সক্ষমতার পরীক্ষা কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন কয়েকশ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় এ সক্ষমতা কম হওয়ায় পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা কম আসছে।’
আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘মহামারীর শুরুতে রোগের কারণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত “সন্দেহজনক” শব্দটি ব্যবহার করা স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের উপসর্গ ও মৃত্যুর ধারা অব্যাহত থাকার পরও “সন্দেহজনক হাম” উল্লেখ করা ঠিক নয়। এখন এসব মৃত্যুকে “সম্ভাব্য হামজনিত মৃত্যু” হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর উপসর্গ দেখেই হাম শনাক্ত করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আক্রান্তদের বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। পুষ্টির ঘাটতি ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে হাম আক্রান্ত হওয়ার পর এসব শিশু দ্রুত শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বেশি।’
এদিকে দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় হাসপাতাল থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ড পুরোপুরি আলাদা রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু আক্রান্তদের চিকিৎসা দিলেই হবে না; হাসপাতাল যেন সংক্রমণ ছড়ানোর নতুন কেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১-এ। আর নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৯। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৫০ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী যেসব শিশু হাম আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে মায়ের শরীর থেকে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা না পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।










