দেশের ১৬৭টি চা বাগানে ২০২১ সালে ৯ কোটি ৬১ লাখ কেজির কিছু বেশি চা উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি কেজি নির্ধারণ করেছে চা বোর্ড। তবে এখন বিপুল পরিমাণে চা উৎপাদন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গড় চা উৎপাদনের হিসাবে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। সম্প্রতি দেশে চা উৎপাদনের একরপ্রতি গড় প্রায় ৭০০ কেজিতে পৌঁছেছে। তবে দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ চা বাগানের একরপ্রতি গড় উৎপাদন ৫০০ কেজিরও কম। প্রায় অর্ধেক বাগানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম হওয়ায় দেশের চা খাতের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

এক দশক আগেও দেশে একরপ্রতি চা উৎপাদন হতো গড়ে ৫০০ কেজি। এ সময়ে একাধিক করপোরেট উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান চা খাতে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। পুরনো ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে করপোরেট খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে যাওয়ার পাশাপাশি চা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করার পর বাগানের উৎপাদনও বেড়ে যায়। সর্বশেষ ২০২১ সালের হিসাবে দেশে একরপ্রতি গড় চা উৎপাদন উঠে এসেছে ৬৯৭ কেজিতে। কিন্তু ৪৩ শতাংশের বেশি বাগানে একরপ্রতি ৫০০ কেজিরও কম চা উৎপাদনের কারণে জাতীয় গড় বাড়ছে ধীরে। এতে চায়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১২ সালে দেশে চা উৎপাদন হয়েছিল ৬ কোটি ২৫ লাখ কেজি। ওই বছর দেশের বাগানগুলোর গড় উৎপাদন ছিল একরপ্রতি ৫০৭ কেজি। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে গড় উৎপাদন বেড়ে হয় ৫৩৪ কেজি। ২০১৪ সালে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন একরপ্রতি কমে হয় ৪৯৮ কেজি। ২০১৫ সালে একরপ্রতি উৎপাদন ফের বেড়ে হয় ৫১৪ কেজি, ২০১৬ সালে ৬৪৩, ২০১৭ সালে ৫৯৮, ২০১৮ সালে ৬১৯, ২০১৯ সালে ৭১৬ ও ২০২০ সালে একরপ্রতি উৎপাদন হয় ৬৩৩ কেজি। তবে সর্বশেষ ২০২১ সালে একরপ্রতি উৎপাদন আরো বেড়ে ৬৯৭ কেজিতে উন্নীত হয়েছে। যদিও দেশের ১৬৬টি উৎপাদনশীল বাগানের মধ্যে ৭১টির একরপ্রতি গড় উৎপাদন আটকে আছে ৫০০ কেজির নিচে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বাগানকে জাতীয় গড়ের সমপর্যায়ের উৎপাদনে নিয়ে যেতে না পারায় বাংলাদেশের চা উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

চা বোর্ডের এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একরপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৯৯ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন করছে ২৩টি চা বাগান, ৩০০ থেকে ৩৯৯ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন করছে ২২টি চা বাগান, ২০০ থেকে ২৯৯ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন করছে ১৯টি বাগান, ১০০ থেকে ১৯৯ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন করছে পাঁচটি চা বাগান এবং একরপ্রতি গড়ে ১০০ কেজির কম চা উৎপাদন করছে দুটি চা বাগান।

সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল চা বাগানগুলোর মধ্যে রয়েছে হালদাভ্যালি, শ্রীগোবিন্দপুর, জেরিন, রামগড়, মাধবপুর, আমতলী, নেপচুন, মির্জাপুর, খৈয়াছড়া, মধুপুরের মতো বাগানগুলো। এসব বাগানে গড়ে একরপ্রতি ৯০০ থেকে ১৫০০ কেজিরও বেশি চা উৎপাদন করা হচ্ছে। মূলত নিবিড় পরিচর্যা, আধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত শ্রমিক নিয়োগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের কারণে এসব বাগানে দেশীয় গড়ের কয়েক গুণ বেশি চা উৎপাদন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাগান মালিকরা বলছেন, চায়ের যথাযথ দাম না পাওয়ার কারণে উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলে সমতলে ক্ষুদ্রায়তন চা চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ওই সব এলাকার চা উৎপাদন প্রতিবছরই রেকর্ডের পর রেকর্ড হচ্ছে। উৎপাদন বাড়লেও এসব চায়ের গুণগত মান প্রতিযোগিতামূলক নয়। এ কারণে দেশের প্রসিদ্ধ বাগানগুলোকে ভালো চা উৎপাদন করেও লোকসানে থাকতে হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের চাষীরা লাভের আশায় কাঁচি দিয়ে কেটে চায়ের পাতা নিয়ে যায়। অথচ চা এস্টেটে প্রথাগত ও বৈজ্ঞানিকভাবে একটি কুঁড়ি দুটি পাতা কিংবা ৫টি পাতা দিয়েই চা উৎপাদনে মনোযোগী বাগান মালিকরা। উত্তরাঞ্চলের চায়ের গুণগত মান রক্ষায় উদ্যোগী না হলে দেশের চা বাগানগুলোর গড় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাড়ানো সম্ভব নয় বলে দাবি করেছেন তারা।

এ বিষয়ে চা বোর্ডের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) মো. মুনির আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের চা উৎপাদন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আমদানির পরিবর্তে আমরা চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছি। এবারই প্রথম চা বোর্ড উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি কেজি নির্ধারণ করেছে। বাগানগুলোর গড় উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় চা উৎপাদনের নতুন মাইলস্টোনে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে কিছু কিছু রুগ্ণ চা বাগান রয়েছে যেগুলো নিয়ে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করছি। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে চা রফতানির দিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেবে বলেও জানান তিনি।

দেশের রুগ্ণ বাগানগুলোর অধিকাংশই চা উৎপাদনের পরিবর্তে বাগানকে ঘিরে চা-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। চা বাগানে অন্যান্য অর্থকরী কৃষি উৎপাদন, মত্স্য চাষ, গাছ বিক্রির মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড চলছে। বাগান মালিকদের কেউ কেউ চা চাষ সম্প্রসারণের পরিবর্তে চা পর্যটন কিংবা গুদাম তৈরির মাধ্যমে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে বেশি মনোযোগী। এক্ষেত্রে চা উৎপাদনের পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চা বিক্রি না করে শুল্ক ফাঁকি দিতে অবৈধ পন্থায় চা বিক্রির অভিযোগও রয়েছে বেশকিছু বাগানের বিরুদ্ধে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি মো. শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের বাগান মালিকরা ভালো চা উৎপাদন করতে চায়। তবে চা চাষে আশানুরূপ লাভবান না হওয়ায় ছোট ছোট অনেক বাগান মালিক চা উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনীহা দেখায়। বড় শিল্প গ্রুপগুলো লোকসানে থাকলেও ভবিষ্যতের আশায় এখনো উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে সার্বিক মূল্যস্ফীতির দিকে তাকালে চায়ের দাম অনেক কম। এ কারণে বাগানগুলোর অনেকেই চা উৎপাদনের চেয়ে ভিন্ন আয়ের দিকে ঝুঁকছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ ছাড়াও চোরাচালান প্রতিরোধের মাধ্যমে চা উৎপাদনের গুণগত মান রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে।

জানা গেছে, সম্প্রতি দেশের বেশকিছু চা বাগানের মালিকানায় এসেছে কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপ। এর মধ্যে সিটি গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রুগ্ণ ও পিছিয়ে পড়া চা বাগান কিনে নিয়েছে। এছাড়া বেশকিছু চা বাগানে রয়েছে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, আধুনিক সেচ সুবিধা না থাকা ও মালিকদের উদাসীনতা। যার কারণে সেসব বাগানে চা উৎপাদন অস্বাভাবিক কম। চা বোর্ডের পক্ষ থেকে এসব বাগানের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাগান মালিক জানিয়েছেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট কোম্পানিগুলোর অনেকেই চা খাতে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু রুগ্ণ ও পিছিয়ে থাকা বাগান মালিকরা তাদের মালিকানা ছাড়তে চায় না। ভালো ভালো প্রতিষ্ঠান চা খাতে বিনিয়োগ করলে উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব হতো। চা বোর্ডও এসব রুগ্ণ চা বাগানের মালিকানা হস্তান্তরে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারায় পিছিয়ে থাকা বাগানগুলো দেশের চা খাতের জন্য বোঝা হিসেবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বলে দাবি করেন তিনি।