রাসেল শাহরিয়ার ২০১৪-১৭ সময়কালে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে আর্থিক খাতের আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের সংশ্লিষ্টতায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এর মধ্যে ৭০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন হয়েছে এফএএস ফাইন্যান্সের তৎকালীন এমডি রাসেল শাহরিয়ারের একক স্বাক্ষরেই। দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানসহ চার সদস্যের একটি দলের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এফএএস ফাইন্যান্সের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে একাধিক অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে পরিচালনা পর্ষদ ও সাবেক এমডি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকারও করেছেন। অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত আরো বেশ কয়েকজনের নামও উল্লেখ করেছেন সাবেক এমডি। জিজ্ঞাসাবাদে আরো যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সিদ্দিকুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম।

২০১৪ সালের শেষদিকে শেয়ার কিনে এফএএস ফাইন্যান্স নিয়ন্ত্রণে নেন পিকে হালদার। কৌশলে পুরনোদের ছাঁটাই করে তাদের পছন্দমতো কর্মী নিয়োগ দেন। সেই সময় এমডি হিসেবে নিয়োগ পান পিকে হালদারের পূর্ব পরিচিত রাসেল শাহরিয়ার। ২০০৭ সালে তারা একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। মূলত উজ্জ্বল কুমার নন্দী তার পছন্দমতো পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগ দেন। সিদ্দিকুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম হলেন পিকে হালদারের বন্ধু এবং ব্যবসায়িক পার্টনার। সে সুবাদে এফএএস ফাইন্যান্সের দায়িত্ব পড়ে সিদ্দিক ও জাহাঙ্গীরের হাতে। অস্তিত্বহীন কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে হবে এ সিদ্ধান্ত আগেই পিকে হালদার দিয়ে দিতেন। লোক দেখানো পর্ষদ সভা হতো এবং পর্ষদে এমডিকে বলে দেয়া হতো কোন কোন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন করতে হবে। সেসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দ্রুত ঋণ ছাড় করা হতো। রাসেল শাহরিয়ার প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব যাচাই ছাড়াই এবং কোনো মর্টগেজ না নিয়ে তার একক স্বাক্ষরে ক্রেডিট মেমো তৈরি করে পর্ষদে উপস্থাপন করে ঋণ অনুমোদন করিয়ে নিতেন। আর এসব ঋণের অর্থ পিকে সিন্ডিকেটের হিসাবে পাঠিয়ে দিতেন। টেকওভার করা ঋণের অর্থও টেকওভারকৃত প্রতিষ্ঠানের হিসাবে না দিয়ে পিকে সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেয়া হতো।

এ প্রক্রিয়ায় ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। কাগুজে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এসএ এন্টারপ্রাইজ, মুন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, সুখাদা প্রপার্টিজ লিমিটেড, ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ, আরবি এন্টারপ্রাইজ, দিয়া শিপিং লিমিটেড, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, নিউট্রিক্যাল লিমিটেড, মেসার্স বর্ন, কণিকা এন্টারপ্রাইজ, দ্রিনান অ্যাপারেলস, অ্যান্ড বি এন্টারপ্রাইজ, এমার এন্টারপ্রাইজ, জিঅ্যান্ডজি এন্টারপ্রাইজ, তামিম অ্যান্ড তালহা, হাল ইন্টারন্যাশনাল, মেরিন ট্রাস্ট লিমিটেড,আর্থস্কোপ ও এমটিবি মেরিন।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এফএএস ফাইন্যান্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে ঋণ পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছেন। এক্ষেত্রে ঋণ আবেদন না নিয়ে যাচাই-বাছাই ও মর্টগেজ ছাড়াই প্রায় ২০টি কাগুজে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া ঋণ দেয়া হয়েছে। এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের রহস্য উদ্ঘাটনে গত তিনদিনে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ২১ জনকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ পরিচালকরা ঋণ অনুমোদনে তাদের অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন। এজন্য তারা দুঃখও প্রকাশ করেন। ঋণের টাকা পুনরুদ্ধার করার জন্য তারা সময় প্রার্থনা করেন। সাবেক এমডি রাসেল শাহরিয়ার প্রাথমিকভাবে অস্বীকার করলেও পরবর্তী সময়ে দোষ স্বীকার করেছে। এজন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে ভুল শুধরে নিতে ও ঋণের অর্থ আদায়ে কিছুদিন সময় চেয়েছেন তিনি।

জিজ্ঞাসাবাদে এফএএস ফাইন্যান্সের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, পিকে হালদার প্রায় সময়ই এমডি রাসেল শাহরিয়ারের রুমে আসতেন এবং পর্ষদ সভাগুলোতে প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন। যদিও তিনি প্রতিষ্ঠানটির কেউ ছিলেন না। এসব ঋণ যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ছাড় করা হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকরা পলাতক এবং ঋণের বিপরীতে কোনো মর্টগেজ নেই। ফলে এসব ঋণের অর্থ আদায় অনিশ্চিত বলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এরই মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্সের বোর্ড পুনর্গঠন করে দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন পর্ষদ খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের নানা ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পিকে হালদারের বিরুদ্ধে অন্তত চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। নানা কৌশলে নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলে শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনে এসব কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেন। অর্থ আত্মসাৎ করেই থেমে যাননি পিকে হালদার। আত্মসাৎ করা অর্থে বিলাসী জীবন কাটিয়েছেন, জমি কিনেছেন। আবার সেই অর্থের একটি অংশ সিঙ্গাপুর, ভারত ও কানাডায় পাচারও করেছেন। পিকে হালদারের অর্থ আত্মসাৎ ও তা পাচারের অভিযোগ এনে একাধিক মামলা দায়ের করেছে দুদক। তাকে গ্রেফতারে এরই মধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। এছাড়া তার মা লীলাবতী হালদারসহ একাধিকজনের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিষয়টি নিয়ে দুদক সচিব মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, এফএএস ফাইন্যান্সের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আত্মসাতের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। পর্যায়ক্রমে আরো অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আরো মামলা দায়ের করা হবে। এছাড়া অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা মিলবে, তাদের বিরুদ্ধেই দুদকের বিধি ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।