রাজতন্ত্রের সংস্কার, প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান-ওচার পদত্যাগ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ব্যাংককের সড়কে নেমে এসেছে থাই জনগণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে এরই মধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে জনসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজতন্ত্রের কট্টর সমর্থক প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান-ওচার সরকার। এ জরুরি ঘোষণার সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য আজই থাই মন্ত্রিসভার একটি জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। তবে শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই গতকালও পথে নেমে এসেছিল বিক্ষোভকারীরা।

আন্দোলনকারীরা বর্তমানে থাই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুললেও তারা পথে নেমেছিল মূলত রাজতন্ত্রের সংস্কার ও কণ্ঠরোধকারী এক আইন বাতিলের দাবিতে। দাবিগুলোও ছিল গণতান্ত্রিক। এসব দাবিতে বলা হয় রাজার অবস্থানকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না, লেস ম্যাজেস্টে আইন বাতিল করে এর আওতায় আটককৃতদের মুক্তি দিতে হবে, রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তির সীমার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করতে হবে, রাজপরিবারের জন্য প্রদেয় কর হ্রাস করতে হবে, সব ধরনের রাজকীয় দপ্তর বিলুপ্ত করতে হবে, রাজকীয় চ্যারিটি হিসেবে দেয়া অর্থের হিসাব জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে, রাজার রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে, রাজতন্ত্রী প্রচার-প্রচারণা বন্ধ করতে হবে, রাজতন্ত্রের সমালোচকদের গুম-খুনের বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করতে হবে এবং রাজার যেকোনো সরকার উত্খাতকারী অভ্যুত্থানকে বৈধতাদানের ক্ষমতাকে বেআইনি বলে ঘোষণা করতে হবে।

আন্দোলনকারীদের এসব দাবি রাজা ও রাজপরিবারকে কেন্দ্র ঘোষণা করা হলেও আদতে এটিকে পদ্ধতিগত গণতান্ত্রিক সংস্কারেরই নামান্তর বলা চলে। কারণ এর ফলে ক্ষমতাসীন প্রায়ুত চান-ওচার নেতৃত্বে ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানটিও অবৈধ হয়ে পড়বে। ন্যায্যতা হারাবে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থায়ী নিযুক্তি দানকারী আইনসভাও। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উত্খাতের দায়ে বিচারের মুখোমুখিও হতে পারেন প্রায়ুত চান-ওচা। একই সঙ্গে এ দাবি মেনে নেয়ার অর্থ হচ্ছে সংবিধানের স্থায়ী সংস্কার, যা দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাবকেও স্থায়ীভাবে খর্ব করে দিতে পারে।

স্বাভাবিকভাবেই এসব দাবি শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নেয়ার কথা নয় বেসামরিক প্রশাসনের আড়ালে সক্রিয় থাই সামরিক জান্তার। ফলে বিক্ষোভকারীরা যেভাবে রাজতন্ত্র সংস্কারের আড়ালে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাইছে, তেমনি প্রায়ুত চান-ওচার সরকারও রাজতন্ত্রকে রক্ষার আড়ালে নিজেদেরই রক্ষার প্রয়াস চালাচ্ছে। গত তিন মাসে নানাভাবে গ্রেফতার, দমন-পীড়নের মাধ্যমে আন্দোলনের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার প্রয়াস চালানো হলেও তার প্রভাব হয়েছে আগুনে ঘি ঢালার মতো। আন্দোলনের নেতা পানুসায়া সিথিজিরাওয়াত্তানাকুল নামে থাম্মাসাত ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রীকে গতকাল সকালেই গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের আগে পানুসায়া বিকালের বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে যান। জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়েই বিক্ষোভটি যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে জনঅংশগ্রহণ ছিল আগের দিনের চেয়েও বেশি।

বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র চালু থাকলেও থাইল্যান্ডের রাজার ক্ষমতা সেখানকার সংবিধানের চেয়েও বেশি। মূল আপত্তির জায়গা হিসেবে এটিকেই সামনে তুলে এনেছে বিক্ষোভকারীরা। জন্মের পর থেকেই প্রত্যেক থাই নাগরিককে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই রাজতন্ত্রের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে শেখানো হয়। এছাড়া যেকোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ভূমিতে আনত হয়ে রাজাকে সম্মান জানানোর নিয়ম থাইল্যান্ডে চালু রয়েছে এখনো। ভূমিতে আনত হওয়া দূরের কথা, রাজার সামনে মাথা সামান্য নিচু করতেও রাজি নয় প্রতিবাদকারীরা।

রাজতন্ত্রের সমালোচনাকে সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবেই মারাত্মক অপরাধ বিবেচনা করা হয়। সামাজিক মাধ্যম বা অন্য যেকোনো ফোরামেই রাজা বা রাজপরিবারের কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বক্তব্য দেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে দেশটিতে। বিশ্বের যেসব দেশে লেস ম্যাজেস্টে (রাজতন্ত্র, রাজপরিবার বা শাসকদের জন্য অপমান কিংবা অসম্মানসূচক বক্তব্য প্রতিরোধে প্রণীত আইন) আইনের সবচেয়ে কঠোর প্রয়োগ হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো থাইল্যান্ড। এ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৫ বছরের জেলও হতে পারে সেখানে।

থাই সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে আইনটির ব্যাপক অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই আইনটির ব্যাপক ও কঠোর প্রয়োগ চলছে। সম্প্রতি এ আইনের প্রয়োগ বেড়ে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। আইনটি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছিল জাতিসংঘও। যদিও তাতে ভ্রূক্ষেপ না করে এর প্রয়োগ বাড়িয়েছে থাই সরকার।

কণ্ঠরোধকারী এ আইনের প্রয়োগ থাই জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্রের প্রতি রীতিমতো ঘৃণা তৈরি করেছে। ফলে আগস্টে পানুসায়া সিথিজিরাওয়াত্তানাকুল নামে ২১ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী ও তার বন্ধুরা যখন রাজতন্ত্র সংস্কারের দাবি তুললেন, তা গণআন্দোলনে রূপ নিতে খুব একটা সময় লাগেনি। এ বিক্ষোভ দেশটিতে থাই রাজপরিবারকে ঘিরে থাকা দীর্ঘদিনের যাবতীয় ট্যাবু রীতিমতো ধসিয়ে দিয়েছে। সংসদেও বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতারা এখন রাজকীয় বাজেট নিয়ে তদন্ত চালানোর দাবি তুলেছেন। মুখ খুলছে সাধারণ জনগণও। জাস্টিন সামুতপ্রাকান নামে এক বিক্ষোভকারী সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়ব। মুক্তির জন্য লড়ব। মানুষ হিসেবে আমাদের সবার মধ্যে সমতা আনার জন্য লড়ব। আমরা আর কখনো মাথা নিচু করব না, ভূমিতে নত হব না, হামাগুড়িও দেব না।

সাবেক থাই সেনাপ্রধান জেনারেল প্রায়ুত চান-ওচা ২০১৪ সালের মে মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকারকে উত্খাত করে দেশটির নির্বাহী শাসনভার হাতে তুলে নেন। পরবর্তী সময়ে প্রায়ুত চান-ওচা অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান জারি করার মাধ্যমে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটনের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিয়ে নিজেই নিজের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করেন। তত্কালীন রাজাও তার এ অভ্যুত্থানের বৈধতা দিয়ে যান। ওই সময় নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও ঘোষণা করেন প্রায়ুত চান-ওচা। ওই বছরের আগস্টেই সামরিক বাহিনীর প্রভাবাধীন অনির্বাচিত আইনসভা তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থায়ী নিযুক্তি দেয়।

বিদেশী গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, থাই রাজা ও তার পরিবারের সদস্যরা বছরের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেন জার্মানিতে। যদিও বর্তমানে তারা থাইল্যান্ডেই অবস্থান করছেন। বুধবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভ চলাকালে থাই রাজা ও রানীকে বহনকারী গাড়িবহর বিক্ষোভস্থলের পাশ দিয়ে যায়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের বাক্যবাণ বা কটূক্তি যাতে রাজা পর্যন্ত না পৌঁছে, সেজন্য জায়গাটিকে কর্ডন রাখেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশের এ আচরণেই স্পষ্ট, থাই সরকার ভয় পেয়েছে।

থাইল্যান্ডে পূর্ণাঙ্গ রাজতন্ত্র চালু ছিল ১৯৩২ সাল পর্যন্ত। ওই সময় সামরিক-বেসামরিক পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা রাজনৈতিক দল খানা রাতসাদনের অভ্যুত্থানে পূর্ণাঙ্গ রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। এর স্থলে আনা হয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। রক্তপাতহীন ওই অভ্যুত্থানে থাই জনগণ ভোটদানের মাধ্যমে দেশের নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বেছে নেয়ার সুযোগ পেলেও সাংবিধানিকভাবে চূড়ান্ত ক্ষমতা থেকে যায় রাজার হাতেই। পরবর্তী সময়ে দেখা গিয়েছে, সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করলেও রাজার ঘোষিত অনুমোদনের ভিত্তিতে তা বৈধতাও পেয়ে গিয়েছে বারবার।

চলতি বছর ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সময় বিশ্বব্যাপী যখন বর্ণবাদী ব্যক্তিদের ভাস্কর্য অপসারণ করা হচ্ছিল, একই সময়ে থাইল্যান্ডেও সরকারি উদ্যোগে ভাস্কর্য ও মিনার অপসারণ কার্যক্রম চলছিল। এসব ভাস্কর্য ও মিনার ছিল মূলত ১৯৩২ সালের অভ্যুত্থানের স্মারক।

গতকাল রাজধানী ব্যাংককের বাণিজ্যিক এলাকা রাচাপ্রাসং এলাকার এক ব্যস্ততম রাস্তার মোড় অবরোধ করে রাখে বিক্ষোভকারীরা। বিকালে সেখানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান-ওচাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানিয়ে স্লোগান দিতে দেখা যায়।

এর আগে সকালে আন্দোলনে পানুসায়াসহ নেতৃত্ব দানকারী শিক্ষার্থীদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতার হওয়ার আগে তারা বিকালের বিক্ষোভ সময়সূচির ঘোষণা দিয়ে যান। এরই ভিত্তিতে স্থানীয় সময় অনুযায়ী বিকাল ৪টা নাগাদ স্থানীয় সেন্ট্রালওয়ার্ল্ড শপিং সেন্টারের সামনে এসে জড়ো হয় বিক্ষোভকারীরা। এ সময় বিক্ষোভকারীদের স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগানের পাশাপাশি আটককৃত আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি তুলতে শোনা যায়। এরপর বিক্ষোভকারীরা বড় একটি মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায়। পথে পুলিশের বাধা পেয়ে রাচাপ্রাসং মোড় অবরোধ করে বসে পড়ে বিক্ষোভকারীরা। সেখানে পুলিশ তাদের লাউডস্পিকারে জরুরি অবস্থাসংক্রান্ত ঘোষণা পাঠ করে শোনায়। একই সঙ্গে বিক্ষোভ আয়োজনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও হুমকি দেয়।

এ সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের দিকে হামলার উদ্দেশে এগিয়ে গেলে বিক্ষোভকারীরা পাল্টা ধাওয়া দিয়ে তাদের পিছু হঠতে বাধ্য করে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান-ওচার বিরুদ্ধে তারা স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে পড়ায় ব্যাংককের স্থানীয় কয়েকটি শপিং মলও বন্ধ করে দেয়া হয়।

পানুপং জাদনক ওরফে মাইক রায়োং নামে এক শিক্ষার্থী এ সময় বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এর আগে বুধবার রাতে গ্রেফতার এড়াতে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি। আন্দোলনের অন্য পাঁচ নেতাকে এরই মধ্যে আটক করেছে পুলিশ। তবে বিক্ষোভকারীদের গতকাল অবরুদ্ধ সড়কে রাতভর অবস্থানের কোনো পরিকল্পনা ছিল না বলে চোনথিচা চায়েংগ্রু নামে এক বিক্ষোভকারীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে ব্যাংকক পোস্ট।