স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি  জেএফআর জ্যাকবকে নিয়ে 

পূর্ব জেরুজালেমে মাউন্ট স্কোপাসের পশ্চিম ঢালে অবস্থিত অ্যামিউনিশন হিলে একটি জাতীয় স্মৃতি স্থাপনা বানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির ইতিহাসে বীর হিসেবে বিবেচিত সাড়ে তিনশ ব্যক্তির নাম-বিবরণ সংবলিত ফলক রয়েছে স্থাপনাটিতে। ফলকগুলোয় এমন এক ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, যিনি কখনো ইসরায়েলের হয়ে যুদ্ধ করেননি। এমনকি দেশটির নাগরিকত্বের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার পরও ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রয়াত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাক ফারজ রাফায়েল জ্যাকবকে (জেএফআর জ্যাকব) নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম বড় বীর হিসেবে বিবেচনা করে ইসরায়েল।

জেএফআর জ্যাকবের দীর্ঘ সামরিক জীবনের সবচেয়ে বীরত্বব্যঞ্জক ঘটনা হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রায় দুই বছর আগেও যখন তাকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ করে পাঠানো হয়, তখনো তিনি কল্পনাও করতে পারেননি একটি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে পড়বে। তিনি বরং উত্ফুল্ল ছিলেন নিজের জন্মস্থান কলকাতায় ফিরে আসতে পেরে। ফোর্ট উইলিয়ামে নিজের অফিস প্রাঙ্গণ থেকে গঙ্গার দৃশ্য দেখতেই পছন্দ করতেন তিনি। ওই সময়কার অনুভূতিকে তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে—‘আমি সে কলকাতায় ফিরে এসেছি; যেখানে আমার জন্ম। যে কলকাতায় আমার শৈশবের দিনগুলো কেটেছে, যে কলকাতাকে আমি ভালোবাসি, সেখানে আমি ফিরে এসেছি। যে কলকাতার কথা আমি ভাবতে ভালোবাসি, যেখানে সাংস্কৃতিক মানসম্পন্ন অনেক বন্ধুসুলভ ও উষ্ণ হূদয়ের মানুষের দেখা পাওয়া যায়, সে কলকাতায় আমি ফিরে এসেছি।’

কার্শিয়াংয়ে পড়াশোনার কারণে শৈশব থেকেই জন্মস্থানের সঙ্গে নিয়মিত বিরহে ভুগেছেন জেএফআর জ্যাকব। পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রাখলে পিতার মতোই ব্যবসায়ী হওয়ার কথা ছিল বাগদাদি ইহুদি পরিবারের সন্তান জেএফআর জ্যাকবের। সে হিসেবে জন্মস্থান থেকে তার দীর্ঘদিন দূরে থাকার প্রয়োজনীয়তাও হয়তো দেখা দিত না। কিন্তু তার যখন ২১ বছর বয়স, সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায় হঠাৎ করেই। ইউরোপে নািসদের বর্বর হলোকাস্টের খবর প্রচণ্ড নাড়া দেয় তাকে। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি ১৯৪২ সালে। পিতা বাধা দিলেও তা উপেক্ষা করেই ফ্রন্টে চলে যান নািসদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।

১৯৪৩ সালে আফ্রিকায় নািসদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন জেএফআর জ্যাকব। সেখানে নািসদের আত্মসমর্পণের পর জ্যাকবের ইউনিটটিকে বদলি করা হয় বার্মায়। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সেখানে জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। দেশভাগের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীতেই থেকে যান তিনি। দীর্ঘ মিলিটারি ক্যারিয়ারে নানা স্থানে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাকে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে তার পোস্টিং ছিল রাজস্থানে। সেখানকার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মরুভূমির যুদ্ধকৌশল সংক্রান্ত ম্যানুয়ালও রচনা করেছেন তিনি। ওই যুদ্ধের পর কয়েক দফা পদোন্নতি পেয়ে ১৯৬৯ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কলকাতায় আসেন মেজর জেনারেল (তত্কালীন) জেএফআর জ্যাকব।

দীর্ঘদিন পর জন্মস্থান ও শৈশবের নির্মল ভাবালুতার আবেশে জ্যাকব যখন মগ্ন হয়ে রয়েছেন, প্রতিবেশী পূর্ব বাংলার বাস্তবতা তখন কঠিন দিকে মোড় নিচ্ছিল। এরই মধ্যে পাকিস্তানের আইয়ুব শাহির পতন ঘটেছে, যার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে পূর্ববঙ্গের সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত অভ্যুত্থান। ইসলামাবাদের মসনদে আসীন হয়েছেন আরেক জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

এদিকে কলকাতায় ফিরে শান্তিতে ছিলেন না জ্যাকব নিজেও। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবেলায়ই ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে তাকে। বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের পূর্ব অংশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তার মাথা ঘামানোর সুযোগ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ ছিল না তার।

১৯৭১ সালের এপ্রিলে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ জেএফআর জ্যাকবকে জানান, নয়াদিল্লি চাইছে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করুক। এর প্রতিবাদ করে জ্যাকব জানান, সীমান্তে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের মোতায়েনকৃত সৈন্য ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো ধরনের সামরিক অভিযানের প্রতিকূলে। উপরন্তু বর্ষায় পূর্ব বাংলার নদীনালা-পথঘাট ও পরিবেশ এ ধরনের যুদ্ধ অভিযানের ক্ষেত্রে বৈরী হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তখনো পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতার চিত্র প্রকাশ পায়নি। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমতও তেমন একটা দানা বেঁধে ওঠেনি। এ অবস্থায় পূর্ব বাংলায় যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্তটি হবে আত্মঘাতী।

এ সময় জেনারেল মানেকশ জানতে চান, কবে নাগাদ পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড তৈরি হতে পারবে? উত্তরে জ্যাকব জানান, উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র ও সাজসরঞ্জাম পেলে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড। এ সময় রাস্তাঘাটও দ্রুত চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠবে।

ইতিহাস বলছে, ওই সময় জ্যাকব যে সময়ের কথা বলেছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে ঠিক ততদিনই সময় নিয়েছেন।

ডিসেম্বরে ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর দ্রুত পর্যুদস্ত হয় পাকিস্তানি বাহিনী। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির যুদ্ধ পরিকল্পনা ছিল, ঘাঁটি এলাকা তৈরি করে মার্কিন ও চীনা সহায়তা আসার আগ পর্যন্ত সেগুলো আঁকড়ে ধরে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে জ্যাকবের পরিকল্পনা ছিল, নিয়াজির এসব ঘাঁটি এলাকাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত ঢাকা দখল করতে হবে। তার এ পরিকল্পনা সে সময় সফল বলে প্রমাণ হয়।

ওই সময়ে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে আত্মসমর্পণ নিয়ে আলোচনার দায়িত্ব দেয়া হয় জেএফআর জ্যাকবকে। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের সে আলোচনায় মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণে নিয়াজি ও রাও ফরমান আলী গড়িমসি করলে জেএফআর জ্যাকব তাদের ৩০ মিনিট সময় দেন। একই সঙ্গে নিয়াজিকে আলাদা করে ভয় দেখিয়ে জানান, এরপর পাকিস্তানি জেনারেলদের নিরাপত্তার কোনো দায়িত্বও তিনি নিতে পারবেন না।

নিয়াজিকে হুমকি দিয়ে এলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন জেএফআর জ্যাকব নিজেই। কারণ ঢাকায় তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাড়ে ২৬ হাজার সৈন্য উপস্থিত। অন্যদিকে ঢাকার কাছে এসে হাজির হওয়া ভারতীয় সৈন্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার। তারাও ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে। দুই পক্ষের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির সময়ও শেষ হতে যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

কিন্তু নিয়াজিকে দেয়া জ্যাকবের হুমকি সে সময় বেশ ভালোই কাজে দিয়েছে। নির্ধারিত ৩০ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পর আবার যোগাযোগ করা হলে নিয়াজি জানিয়ে দেন তিনি আত্মসমর্পণে প্রস্তুত।

এ বিজয় বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের কাছে জ্যাকবের জন্য বীরের মর্যাদা বয়ে এনেছে। ইসরায়েলও চেয়েছিল, ভারতীয় ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানের অধিকারী ব্যক্তিটি সে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করুক। কিন্তু ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জ্যাকব বলেছিলেন, আমি ভারতের সন্তান। ভারতের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করব। আমি আমার দেশেরই সেবা করেছি এবং দেশকেই ভালোবেসেছি।

দেশপ্রেমের অনন্য নজির রাখা এ বীরকে তার উপযুক্ত সম্মান জানিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। অন্যদিকে নাগরিকত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও তাকে সম্মান জানাতে ভুল করেনি ইসরায়েলও।