দেশে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) পথচলার শুরু ১৯৮১ সালে। এরপর গত ৩৯ বছরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৩৫টি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় তহবিল ও সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক লক্ষ্যের অভাব এবং ঢাকার বাইরে গ্রাহকদের কাছে সেভাবে পৌঁছতে না পারায় এর অধিকাংশই ব্যবসায় খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছে না। ফলে দেশে এনবিএফআই ব্যবসায় শীর্ষস্থানীয় হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যই বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান ও এনবিএফআই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায়ও দেখা যাচ্ছে, এনবিএফআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও অগ্রিম বাবদ বিনিয়োগের ৪০ শতাংশই শীর্ষ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের এনবিএফআইগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৬৯ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে বলবৎ ছিল সাধারণ ছুটি। এরপর অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু হলেও তার পরিসর হয়ে পড়ে সীমিত। ফলে চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে এনবিএফআইগুলোর তেমন ব্যবসা হয়নি। এ কারণে জুন শেষেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৩৫টি এনবিএফআইয়ের মধ্যে ২৩টি বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জুন প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের এনবিএফআইগুলোর মধ্যে বর্তমানে ঋণ ও অগ্রিমের ভিত্তিতে শীর্ষস্থানে রয়েছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ৯ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এনবিএফআইগুলোর মোট ব্যবসায় প্রায় ১৩ শতাংশই প্রতিষ্ঠানটির দখলে। জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটিতে আমানতের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা।

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফ খান বণিক বার্তাকে বলেন, তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে এনবিএফআইগুলোকে বরাবরই চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকতে হয়। এক-দুই বছর ধরেই এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য সংকটের মধ্যে ছিল। এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো করছে, তাদের সবারই পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে। পেশাদারিত্বের পাশাপাশি সুশাসন ও দক্ষ মানবসম্পদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করতে পেরেছে। অন্যদিকে যারা ভালো করতে পারছে না, তাদের সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক লক্ষ্যের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল বলে মনে হয়। তাছাড়া আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে রয়েছে। আমাদের দেশের অর্থনীতির যে আকার, সে তুলনায় ৩৫টি এনবিএফআই বেশি। এ খাতে যে পরিমাণ ব্যবসার সুযোগ রয়েছে, সে তুলনায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। ফলে ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশল ও লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এছাড়া একাধিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েও টিকে থাকতে হতে পারে তাদের।

মার্কেট শেয়ারের দিক দিয়ে এনবিএফআইগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেড। চলতি বছরের জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকায়। এনবিএফআই খাতের প্রায় ৯ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির দখলে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মোট আমানতের পরিমাণ ৪ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা।

লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাজা শাহরিয়ার বলেন, করোনার আগে থেকেই তারল্য সংকটের কারণে এনবিএফআইগুলোকে সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এতে ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানকেই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আবার কভিড-১৯ চলাকালে কিস্তি আদায় কার্যক্রম একেবারেই প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং আমরাও অনেকাংশে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। প্রতিষ্ঠিত ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা অনেক বেশি। ফলে নানামুখী সংকট সামলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আর এ সক্ষমতা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের উত্তম করপোরেট সুশাসন পরিপালনের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। আমাদের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে পর্ষদের অযাচিত কোনো হস্তক্ষেপ কখনই ছিল না। পেশাদার কর্মীদের সমন্বয়ে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। যেসব এনবিএফআই সমস্যায় পড়েছে, তাদের প্রত্যেকটিতে সুশাসনের অভাব ছিল। ছোট প্রতিষ্ঠান যারা রয়েছে, তাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অবশ্যই করপোরেট সুশাসন মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে অনেক বেশি গ্রাহকের কাছে নিজেদের উপস্থিত করতে হবে। তহবিল সংগ্রহের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চক্র থেকে এনবিএফআইগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটি ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য।

দেশের প্রথম এনবিএফআই হিসেবে লাইসেন্স পেয়েছিল আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড। ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ মার্কেট শেয়ারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান তৃতীয়। এ বছরের জুন শেষে আইপিডিসির ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮২৩ কোটি টাকায়।

আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসি) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুনির্দিষ্ট খাত বা পণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবসা করছে। ফলে সেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু আমাদের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। আমাদের দেশেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক মডেলের মাধ্যমে কার্যক্রম চালাতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে তাদের মূলধন সক্ষমতার বিষয়টি নির্ধারণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে যাদের কার্যক্রম সীমিত, তাদের মূলধন ভিত্তি থাকবে কম। মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান যেগুলো রয়েছে এবং যারা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে, তাদের মূলধন ভিত্তি আরো বেশি শক্তিশালী থাকতে হবে। আর সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আমানত না নিলেও বড় আকারের প্রতিষ্ঠান যেগুলো রয়েছে, তাদের মূলধন ভিত্তি আরো শক্তিশালী হতে হবে। এভাবে শ্রেণীকরণ করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি কমবে এবং যার যার সক্ষমতা অনুসারে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবে।

দেশে আবাসন খাতকেন্দ্রিক ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং (ডিবিএইচ) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মার্কেট শেয়ার ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ বছরের জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।

উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের দখলে রয়েছে এনবিএফআই ব্যবসার ৫ শতাংশ। এ বছরের জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির আমানত দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা।

দেশের ব্যাংক খাতের বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি ও সুশাসনের ঘাটতি এক সময় সংক্রমিত হয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। ২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড ও ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছিল। এর পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আরো বেশকিছু অনিয়ম উদ্ঘাটিত হয়। এনবিএফআইগুলোকে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে এমনিতেই বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকতে হয়। এর সঙ্গে আর্থিক অনিয়ম বিষয়টি সামনে আসায় গ্রাহকের আস্থা হারাতে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। পিপলস লিজিং অবসায়নের ঘোষণা এবং সর্বশেষ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পিকে হালদারের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশের পর এনবিএফআইয়ের প্রতি গ্রাহকদের এ আস্থার সংকট আরো তীব্র হয়ে ওঠে। অথচ খারাপ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেশকিছু এনবিএফআই রয়েছে, যাদের অবস্থা অনেক ব্যাংকের চেয়েও ভালো।

সার্বিক বিষয় নিয়ে বিএলএফসির ভাইস চেয়ারম্যান ও ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের এমডি এজেডএম সালেহ বণিক বার্তাকে বলেন, তহবিলের উৎস নিয়ে এনবিএফআইগুলোর সমস্যা রয়ে গেছে। আমানত সংগ্রহ করতে না পারলে ব্যবসা করবে কীভাবে? যাদের অবস্থা ভালো, তারাই বেশি আমানত পাচ্ছে। তহবিল সমস্যার সমাধানের জন্য ব্যাংক ও এনবিএফআইগুলোর আমানত ও ব্যবসার ক্ষেত্রগুলো সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার সময় এসেছে। আর ঢাকাকেন্দ্রিক প্রবণতা কাটিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছতে হলে ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবসার ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে বর্তমানে যারা পিছিয়ে রয়েছে, এক পর্যায়ে গিয়ে তারা আর টিকে থাকতে পারবে না।