রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় অবস্থিত সিটি চিকলি পার্ক অব্যবস্থাপনা ও নানা সংকটে ধুঁকছে। পার্কটি বিনোদনপ্রিয় মানুষকে আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ পার্ক চালুর আগেও এলাকাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতিদিন সহস্রাধিক মানুষের সমাগম হতো।
বর্তমানে পার্কের প্রবেশমূল্য বাবদ কর্তৃপক্ষ মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও পার্ক সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেই। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করে পার্কের আধুনিক সুবিধা না পেয়ে দর্শনার্থীরা হতাশ। এজন্য তড়িঘড়ি করে পার্কটি চালু এবং পরবর্তী সময়ে পার্ক নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়াকে দায়ী করেছেন বিশিষ্টজনরা।
এদিকে সিটি করপোরেশনের মালিকাধীন পার্ক লাগোয়া চিকলি ওয়াটার পার্কে প্রবেশ করতে গিয়ে দর্শনার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বেসরকারি এ পার্কের প্রবেশপথের ৫০ গজ আগেই সিটি করপোরেশনের পার্কের গেট রয়েছে। ফলে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ২০ টাকা দিয়ে টিকিট নিতে বাধ্য করছেন সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের বক্তব্য অনেকটা জোর যার মুল্লুক তার মতোই। বেসরকারি চিকলি ওয়াটার পার্ক কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে রহস্যজনকভাবে নীরব। দর্শনার্থীদের প্রশ্ন তারা বেসরকারি পার্কে যেতে কেন সিটি করপোরশনকে টাকা দেবেন। কারণ ওই পার্কেও ঢুকতে ৩০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হচ্ছে। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে কর্মচারীদের হাতে দর্শনার্থীদের লাঞ্ছিত হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
নগরীর ধাপ এলাকায় সাগর পাড়াসংলগ্ন সিটি করপোরেশনের প্রায় ১০০ একর নিজস্ব জমিতে ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল প্রয়াত সাবেক মেয়র সরফুদ্দিন আহমেদ ঝণ্টু চিকলী পার্কটির উদ্বোধন করেন। শুরুতে পার্কটিকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল দেখা দেয়। কারণ এলাকাটি আগেও একাধিক বিল, সবুজের সমারোহ এবং
নিরিবিলি পরিবেশের একটু ছোঁয়া পেতে অনেকে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে টিকিট কেটে পার্কে প্রবেশ করা দর্শনার্থীদের মাঝে এখন শুধুই হতাশা। ভগ্নদশা রাইডসগুলো দেখে যে কারো এটিকে জাদুঘর বলে মনে হতে পারে। দর্শনার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়া পার্কটি সুনসান প্রায়। শুরুতে পার্কে বেশকিছু দোকান গড়ে উঠলেও বর্তমানে কেনাবেচা কমে আসায় টিকে আছে হাতেগোনা কয়েকটি দোকান। সিটি চিকলি পার্কে প্রবেশ করতে মূল গেট দুটি। একটি ধাপ এলাকায় আর একটি হনুমান তলা এলাকায়। পার্কে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা।
সরেজমিনে পার্কে দেখা গিয়েছে, শিশুদের জন্য নির্মিত বিভিন্ন রাইডস—সাঁজোয়া যান, মেরি গো-রাউন্ড, বাম্পার কার, চার্জার কার এবং অর্ধ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা ট্রেন লাইন দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বর্তমানে মাত্র দুটি ঘূর্ণি জাতীয় রাইডস চালু আছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী। তিনি বলেন, ‘যখন সকল রাইডস চালু ছিল তখন মানুষের ভিড় হতো। এখন অনেক কমে গিয়েছে। স্পিড বোটে ওঠার জন্য অনেকে পার্কে আসতেন।’
জলযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মো. জাকির বলেন, আগে তিনটি স্পিডবোট সচল ছিল। বর্তমানে একটি চালু আছে। আগে প্যাডেল বোর্ড চার-পাঁচটি চলত। বর্তমানে একটিও চালু নেই।
দর্শনার্থী সহিদুল ইসলাম ও রনি রহমান বলেন, বর্তমানে পার্কের যে ভগ্নদশা তাতে টিকিট কেটে দর্শনার্থীদের আফসোস হতেই পারে। কারণ এখন শুধু নষ্ট রাইডস দেখা ছাড়া আর কিছু নেই। তারা স্মৃতিচারণা করে বলেন, পার্ক তৈরির আগে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন বিকালে ব্যাপক সমাগম হতো।
অন্যদিকে দ্বিতীয় গেট অর্থাৎ হনুমান তলা এলাকা দিয়ে পার্কে প্রবেশ করে নতুন দর্শনার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নতুন দর্শনার্থী কবির ও নিশি দম্পত্তি বর্ণনা করলেন এভাবে, গেট দিয়ে পার্কে প্রবেশ করে অধিকাংশ নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা সিটি পার্কের রাইডস দেখে
ডান দিকে গড়ে ওঠা চিকলি ওয়াটার পার্কে ঢুকতে চাইলে তাদের আটকিয়ে দেয়া হয়। ভেতরে প্রবেশ করার জন্য টিকিট করতে বলা হয়। টিকিটের কথা শুনে প্রথম তাদের একটু মনে খটকা লাগে। টিকিট আছে বলে জানালে তারা জানান, ওয়াটার পার্ক লিজ নেয়া জমিতে গড়ে ওঠা আলাদা পার্ক। তাই এ পার্কে প্রবেশ করতে নতুন করে টিকিট নিতে হবে। বাধ্য হয়ে পুনরায় জনপ্রতি ৩০ টাকা করে টিকিট সংগ্রহ করেন। শুধু চিকলি ওয়াটার পার্কে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সাবরিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি ওয়াটার পার্কে
ঢুকব, কিন্তু শুধু কয়েক গজের মধ্যে দুই স্থানে টাকা নেয়ার কি যুক্তি আছে?
কয়েক গজের মধ্যে দুই স্থানে টাকা নেয়ার বিষয় জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত চিকলি ওয়াটার পার্কের পরিচালক মো মাসুদুন নবী মুন্না বলেন, প্রথম গেটটি পরিচালনা করে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। আর দ্বিতীয় গেটটি ওয়াটার পার্কের একটি মাত্র মূল গেট। তাই দর্শনার্থীদের ভোগান্তি দূর করার জন্য তিনি মেয়রকে অবগত করেছেন। পাশাপাশি একসঙ্গে একটি গেটের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের প্রবেশের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের সদ্যবিদায়ী মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, সিটি চিকলি পার্কের আধুনিকায়নে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এরই মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। তাই এগুলো বাস্তবায়ন হলে পার্কের চেহারার আমূল পরিবর্তন হবে। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হতে পারে তা তিনি জানাননি। পার্কে প্রবেশে কয়েক গজের মধ্যে দুটি আলাদা গেটের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথম গেটটি সিটি করপোরেশন পরিচালনা করে। তাই সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নাই। তবে শুধু বেসরকারি পার্কে ঢুকতে হলে সিটি করপোরেশনকে কেন অতিরিক্ত ২০ টাকা দিতে হবে, এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি দেননি।










