রংপুর কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এ অঞ্চলের জমি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এজন্য কৃষক প্রচুর আলু চাষ করেন। চলতি মৌসুমে জেলায় ১৯ লাখ ৪৩ হাজার ৭১০ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। তবে জেলায় ৪০টি হিমাগারে ধারণ-ক্ষমতা রয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টন। উদ্বৃত্ত আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না চাষীরা। এছাড়া উৎপাদনের তুলনায় বাজার দাম কম থাকায় আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। এ অবস্থায় পশুর বিকল্প খাদ্যতালিকায় যুক্ত হয়েছে কৃষিপণ্যটি।

তবে পশু চিকিৎসকরা বলছেন, গরুকে আলু না খাওয়ানোই ভালো। কারণ কীটনাশকযুক্ত আলু গরুর বিপদ ডেকে আনতে পারে।

রংপুরের সাবেক তামপাট ইউনিয়নটি বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে যুক্ত হয়েছে। এলাকাটি বরাবরই আলু আবাদের জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রতিটি কৃষক পরিবার আলু আবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে আলুর দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক। অনেকে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে না পেরে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছেন।

ওই ওয়ার্ডের রঘুবাজারের বাসিন্দা ভূপাল চন্দ্র বর্মণ। এ বছর তিনি ২৫ দোন (এক দোনে ২৪ শত কে) জমিতে আলু আবাদ করেছেন। সময়মতো বুকিং দিতে না পারায় হিমাগারে বেশি আলু রাখতে পারেননি। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু ১০ থেকে সাড়ে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ১৫ টাকার ওপরে। তাই আলু সেদ্ধ করে গরুকে খাওয়াচ্ছেন। অন্য খাবার কম দিয়ে গরুকে বেশি বেশি আলু খাওয়াচ্ছেন তিনি।

গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের খামার মোহনা গ্রামের বাসিন্দা রমা আক্তার। তার পাঁচটি গরুর নিত্যদিনের খাবারে পরিণত হয়েছে সেদ্ধ আলু। তবে মাঝে মাঝে সময় না পেলে কাঁচা আলুই গরুকে খেতে দেন।

রমা আক্তার স্বামী সামিউল ইসলাম বলেন, ‘এবার দুই বিঘা (২৭ শতকে ১ বিঘা) জমিতে ক্যারেজ জাতের আলু আবাদ করেছি। খরচ হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। বাজারে আলুর দাম কম হওয়ায় গরুর বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছি।’

শুধু রংপুর সিটি করপোরেশন ও গঙ্গাচড়া উপজেলা নয়, জেলার আটটি উপজেলায় এখন গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে আলু। তবে আলুকে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন পশু চিকিৎসকরা।

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রহমত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আলু হচ্ছে শর্করাজাতীয় খাবার। বেশি পরিমাণে খাওয়ালে গরুর পেটফাঁপা অসুখ দেখা দিতে পারে। কাঁচা আলু বেশি খাওয়ালে গরুর অন্যান্য অসুখও হতে পারে। আলুতে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। কাঁচা আলু গরুকে খাওয়ানো হলে বিষক্রিয়া হয়ে হতে পারে।’

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি (২০২৪-২৫) মৌসুমে জেলায় ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। এ থেকে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৩ হাজার ৭১০ টন। গত বছর ৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ১৫ লাখ ২৬ হাজার টন। তবে জেলার ৪০টি হিমাগারে আলু ধারণক্ষমতা রয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টন। ২৩ মার্চ পর্যন্ত হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ হয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৩৬০ টন। ধারণক্ষমতার চেয়ে আলু উৎপাদন হয়েছে প্রায় পাঁচ গুণ । গত বছর এ সময়ে আলু ২৫-৩০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে। তবে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে সাড়ে ১০ টাকা।

এ ব্যাপারে রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছর কৃষক আলুর ভালো দাম পেয়েছে। এজন্য এবার বেশি জমিতে আলুর আবাদ হয়েছেন। এছাড়া বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় আলুর উচ্চ ফলন হয়েছে।’