দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৯৬৮ সালে বরিশালে স্থাপিত হয় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল। নির্ভুল রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থাপন করা হয় ৪৯৬টি মেশিন। তবে অযত্ন-অবহেলায় অর্ধেক মেশিন এখন আর কাজ করছে না। স্থাপিত মেশিনের মধ্যে ২৪২টিই অচল হয়ে পড়েছে। ১২৮টি মেরামতযোগ্য হলেও মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি ও নির্দেশনার অভাবে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কিছু মেশিনের প্যাকেট খুলে দেখা গেছে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

সেবাপ্রত্যাশীরা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের বিশেষায়িত এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বছরে অন্তত ১০ লাখ মানুষ বহির্বিভাগে এবং পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ অন্তঃবিভাগে চিকিৎসা নেন। রোগীদের জন্য সরকার যেসব সেবা নিশ্চিত করেছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের সিরাম মেশিনটি দেয়া হয় ২০১৫ সালে। এটি স্থাপনে স্থান নির্বাচনসহ আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় হয়ে যায় ছয় বছর। এর পর মেশিনের দরপত্র ও সরবরাহ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। সেই থেকে অবহেলায় এটি পড়ে রয়েছে। একইভাবে সিটি স্ক্যান মেশিনে পানি পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কেন পানি পড়ল তা খুঁজতে সময় পার হয়েছে দুই বছর। এখন মেশিনটি পুরোপুরি অচল। এমআরআই মেশিনটিও চালু হওয়ার ছয় মাস পর থেকে অচল হয়ে পড়েছে। সিরাম মেশিনটি চালুর পর এর রি-এজেন্ট অন্য কোম্পানির হওয়ায় এটিও এখন অচল।

হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোজিস্ট বাবুল আখতার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ ভারী মেশিনগুলো অচল হওয়ার পর আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তবে কোনো জবাব আসেনি। এগুলো যে অকশনে বিক্রিও করতে পারছি না। অনেক মেশিন অতি পুরনো, আবার কিছু রয়েছে নতুন। তবে সবই অচল।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে একটি এয়ার্ম, একটি সিরাম, দুটি সিটি স্ক্যান, একটি এমআরআই, একটি অটোক্লেভ, ১২টি ডেন্টাল ইউনিট, ৩টি ক্যান্সার নির্ণয়কসহ ২৫২টি মেশিন অচল। মেশিন কম ও রোগী বেশি থাকায় রোগ নির্ণয় ও রিপোর্ট পেতে রোগীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক্স-রে করালে রিপোর্ট মেলে একদিন পর। রোগ নির্ণয়ের মেশিন নষ্ট থাকায় রোগীরা সব পরীক্ষার জন্য বাইরে চলে যান।’

নগরীর ধান গবেষণা রোড এলাকার ফজলুর রহমান বলেন, ‘দুইদিন আগে টেস্ট করেও রিপোর্ট মেলেনি, ভোরে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুরেও থেরাপি দিতে পারিনি। হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের মেশিন কম, তবে রোগীর চাপ বেশি।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অচল এসব মেশিনের দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি। হাসপাতালের অর্থ ও ভাণ্ডার শাখা থেকে বলা হয়েছে এসব মেশিনের ত্রুটি সারানোর জন্য নিয়মিত প্রকৌশলী তাদের নেই। একটি মেশিনে সামান্য ত্রুটি দেখা দিলেও তা মেরামত করতে দিনের পর দিন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি চালাচালি করতে সময় পার হয়ে যায়। এ সময়ের মধ্যে মেশিনগুলোর সামান্য ক্ষতি বড় ক্ষতিতে রূপ নেয়। যদি হাসপাতালেই মেশিনগুলো মেরামতের ব্যবস্থা থাকত তাহলে রোগীদের সেবায় বিঘ্ন ঘটত না।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভাণ্ডার) ডা. মো. রেজুয়ানুর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অচল মেশিন মেরামতে সরকারি কিছু নির্দেশনা থাকে। আমরা সে নির্দেশনার বাইরে যেতে পারি না। এখানে অচল মেশিন মেরামত করতে হলে আমাদের প্রকৌশল শাখাকে জানাতে হয়। তাদের প্রত্যয়নসাপেক্ষে তাদের নিজস্ব জনবল সেটা মেরামত করে। অনুমতি নিতে নিতেই দীর্ঘ সময় চলে যায়। প্রশাসনিক জটিলতা যদি সহজ করে, তাহলে দ্রুত মেশিনগুলো মেরামত করা যাবে।’

নানা জটিলতায় দামি মেশিনগুলো অচল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এবার কারণ অনুসন্ধানের কথা ভাবছেন তারা। প্রতিটি স্তরে অব্যবস্থার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এখন থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।

সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই মেশিন সরবরাহের পর তা স্থাপনে জটিলতা দেখা দেয়। অনেক সময় মেশিন এলেও সরবরাহকারী কেউ-ই আসে না। কিছু মেশিন আছে, যা আর মেরামত করা যাবে না। অন্যগুলো মেরামতের চেষ্টা করা হবে। আমরা একটি টিমের মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগের মেশিনগুলোর হালনাগাদ তথ্য নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেব। সে ক্ষেত্রে কেন মেশিনগুলো অচল হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’