নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার বিরুদ্ধে যে মামলা সেটা সরকার করেনি। তার বিরুদ্ধে আমাদের গভর্নমেন্ট লাগেনি। কল্যাণ ফান্ডের টাকা না দেয়ার কারণে শ্রমিকরা মামলা করেছে। সরকার মামলা করেনি। শ্রমিকরা লেবার কোর্টে মামলা করেছে। সেই মামলায় সে শাস্তি পেয়েছে। এখানে আমার কী দোষ?

মঙ্গলবার (২৫ জুন) বেলা ১১টার দিকে গণভবনে সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

টাইম ম্যাগাজিনে ড. ইউনূসকে নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, মামলা চলছে এজন্য কমেন্ট করতে চাই না। কিন্তু যখন প্রশ্ন এসেছে দু চারটা কথা না বললে মানুষ বোধহয় ভুল বুঝবেন। তবে একটা প্রশ্ন তাদের করতে পারেন, আমেরিকা বা ইউরোপ হোক যেকোনো দেশে কেউ যদি বছরের পর বছর ট্যাক্স ফাঁকি দেয় তার বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নেয়? সে উত্তরটা কিন্তু এরা দেয়নি। দ্বিতীয়ত শ্রমিকদের নিয়ে এত কথা হয় সে শ্রমিকদের কল্যাণ ফান্ডের টাকা যদি কেউ না দেয়, মেরে খায়। তার বিরুদ্ধে এরা কী ব্যবস্থা নেবে। কী ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

সরকার প্রধান বলেন, আপনাদের মনে আছে গ্রামীণ ব্যাংক তৈরি হয়েছিল জেনারেল এরশাদ সাহেবের আমলে। একজন এমডি খোঁজা হচ্ছিল তখন ড. ইউনুসকে এনে সে ব্যাংকের এমডি করা হয়। এ ব্যাংক কিন্তু তার নিজের করা নয়। সে সেখানে এমডি হিসেবে চাকরি করত এবং বেতন তুলতেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি এমনভাবে প্রচার করেছেন যেন এটা উনার নিজেরই করা।

শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক সরকারের সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। বেতন সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হতো। তাদের কেউ বাইরে গেলে জিও নিয়ে যেতে হতো। ওই ব্যাংকের আইনেই ছিল ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত একজন এমডি চাকরিতে থাকতে পারবেন। ৬০ বছরের পরও আরো দশ বছর তিনি আইন ভঙ্গ করে ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়টি নজরে আনে। আমাদের অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী তাকে অনুরোধ করেছিলেন আপনার তো বয়স হয়ে গেছে। অবৈধভাবে এরই মধ্যে ১০ বছরের বেশি আছেন। আপনি এখানে উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন। কিন্তু তিনি এমডি পদ ছাড়বেন না। এমডি পদে তাকে রাখতেই হবে। ড. ইউনূস আমাদের সরকার, অর্থমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন। সে দুটি মামলায়ই হেরে যান। তার বিরুদ্ধে সরকার কখনো মামলা করেনি। এ কথাটা ওই পত্রিকাওয়ালারা লেখেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনো তার বিরুদ্ধে যে মামলা সেটাও সরকার করেনি। শ্রমিকদের কল্যাণ ফান্ডের টাকায় ২০০৬ সাল থেকে একটি টাকাও দেয়নি। তখন শ্রমিকরা মামলা করেছে। 

তিনি বলেন, গ্রামীণ ফোন সেটা আমিই তাকে (ইউনূসকে) দিয়েছিলাম। এটাও মনে রাখা উচিত। গ্রামীণ ব্যাংক প্রায় কলাপস করে যাচ্ছিল। তখন প্রথমে একশো, পরে দুইশ ও আরো একশো কোটি টাকা দিই। এ চারশ কোটি টাকা সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দিয়ে ব্যাংকটা চালু রাখতে সহায়তা করি। তখন তিনি প্রস্তাব দিলেন একটি ফোন পেলে গ্রামের মেয়েদেরকে দেবেন। এর থেকে যে লাভ হবে তা গ্রামীণ ব্যাংকে জমা হবে। সেটা দিয়ে ব্যাংক চলবে। তাকে জিজ্ঞেস করা উচিত আজ পর্যন্ত ওই গ্রামীণ ফোনের একটি টাকাও গ্রামীণ ব্যাংককে দেয়া হয়েছে কিনা? দেয়া হয়নি।

গ্রামীণ ব্যাংকের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য অনেক সময় বিদেশ থেকে অনুদান এসেছে তার কয়টা টাকা গ্রামীণ ব্যাংকে গেছে? প্রতিটি সময় সেটা নিয়ে নতুন একটি ব্যবসা খুলে ব্যবসা করেছেন। কিন্তু কোনো ট্যাক্সই দেননি। তিনি যে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন এটাতো তিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন। কারণ তার বিরুদ্ধে যখন মামলা হয়েছে তিনি কিছু টাকা শোধ দিয়ে বসে আছেন। যখন কিছু টাকা দিল এতে তো প্রমাণ হলো যে তিনি ট্যাক্স ফাঁকি দেন। এমন কি টেলিনর-গ্রামীণ ফোন থেকেও কয়েক দফায় এভাবে ট্যাক্স আদায় করা হয়েছে।

ইউনূসের উত্থানের পেছনে সরকারের অবদান রয়েছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, এটা ঠিক তাকে আমরা সবাই মিলে তুলেছি। আমরা খুব প্রমোট করেছি। এটা ঠিক। এখন সব দোষ আমার। আমি তাকে সব থেকে বেশি দিলাম। এটুকু কৃতজ্ঞতা তো থাকা দরকার। আজকে তিনি যে উঠেছেন- সেখানে সব থেকে বেশি সহযোগিতা আমিই করেছিলাম। তার মাইক্রো ক্রেডিট আন্তর্জাতিকভাবে খুব বেশ গ্রহণযোগ্য ছিল না। মাইক্রো ক্রেডিট সামিটে আমি কো চেয়ার হিসেবে অংশগ্রহণ করি। জাতিসংঘে প্রস্তাব আনি এবং সবাইকে বোঝাই। কারণ আমিও ভাবতাম যে মানুষকে দারিদ্র মুক্ত করেন, এটি খুব ভালো। কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম- এটা দারিদ্রমুক্ত নয়, এটা দারিদ্র লালন-পালন করে। ওই মানুষগুলোকে দিনরাত কাজ করার পর প্রায় ৪০/৪৫ ভাগ সুদ দিতে হতো। যশোরের যে এলাকায় হিলারি ক্লিনটনকে নিয়ে যাদের ক্ষুদ্রঋণ দিয়েছিল সে পরিবারগুলো এখন কোথায়? খোঁজ নেন।

দারিদ্র বিমোচনে গ্রামীণ ব্যাংক কোনো ভূমিকা রাখেনি এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নিয়েছে জমিজমা সব বেচে দিয়ে তারা ওখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। অনেকে আত্মহত্যা করেছে এ সুদের চাপে। আমি তাকে টাকা দিয়ে বলেছিলাম এত সুদ না নিয়ে মানুষের জন্য যেন একটু সহনশীল করে দেন। মানুষ সত্যিকার অর্থে যেন দারিদ্র থেকে উঠে আসতে পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, বস্তুত তিনি এতই যদি করে থাকেন তাহলে দারিদ্র বিমোচন হলো না কেন বাংলাদেশে? দারিদ্র বিমোচন তো আমি করলাম। আজকে দারিদ্র ৪১.৬ ভাগ থেকে ১৮.৭ ভাগে নামিয়ে এনেছি মাত্র ১৫ বছরে। সে ক্রেডিটও তিনি নেন। সেটাও কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা লিখে ফেলে। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক এটা করে ফেলেছে। আমার প্রশ্ন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে ওই দারিদ্রের হার কত শতাংশ ছিল? আমি আসার পর কতটা কমেছে। সেটা একটু হিসাব করে বলুন।

নোবেল পুরস্কার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নাকি জেলাস নিবন্ধে এমন কথাও উঠে এসেছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, অনেকে নাকি লিখেছে নোবেল প্রাইজের জন্য আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব। আমার সঙ্গে কারো দ্বন্দ্ব নেই। নোবেল প্রাইজের জন্য আমার কোনো আকাঙ্ক্ষাও নেই। কারণ আমার লবিষ্ট রাখার মতো টাকা নেই। আর আমি কখনো সেটা চাইনি। হ্যাঁ, পার্বত্য শান্তি চুক্তি হওয়ার পর শুধু আমার দেশ নয়। দেশে বিদেশে অনেক নোবেল লরিয়েটরা আমার জন্য লিখেছে। কই আমি তো কখনো তদবির করতে যাইনি। কারো কাছে বলতেও যাইনি। কী পেলাম না পেলাম ওইগুলো আমার মাথার মধ্যেও নেই। যিনি অর্থনীতি নিয়ে কাজ করলেন-ব্যাংকের একজন এমডি। তিনি যখন নোবেল প্রাইজ পান তার সঙ্গে আমি কেন কনটেস্ট করতে যাব?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে অনেকে এসেছে। আমি বলেছি আমার এসব পুরস্কারের দরকার নেই। আর আমি দেখেছি এ পুরস্কার যারা পায় তাদের আন্তর্জাতিকভাবে কতটুকু অবদান সেটা নয়। এখানে আলাদা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে।

তিনি বলেন, আমার আকাঙ্ক্ষা নেই। আর বলে দিল এটা নিয়ে আমি নাকি উনার ওপর জেলাস। শেখ হাসিনা কারো সঙ্গে জেলাসি করে না। শেখ হাসিনা ফাদার অব ন্যাশনের মেয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মেয়ে। অন্তত এ জায়গাটায় কেউ আসতে পারবে না। সেটাই আমার গর্ব। প্রধানমন্ত্রী এটা তো সাময়িক ব্যাপার।

নিবন্ধ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, সে এখন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামির জন্য এত কথা কীভাবে লেখে একজন সাংবাদিক। ওই সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা করুন। মামলা করেছে তার লেবাররা। লেবাররা যখন প্রমোশন চেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে স্যাক করে দিয়েছে। পরে তারা মামলা করেছে। আমি জানতামও না এটা, আর লেবার কোর্টের মামলায় শাস্তি পেয়েছে। লেবারদের কী কোনো অধিকার নেই? যারা লেবার নিয়ে এত কথা বলেন। মানবাধিকারের কথা বলেন। এত কিছু বলেন, তারা কোথায় এখন? তারা চুপ কেন? তারা এ লেবারদের পাশে কী দাঁড়িয়েছেন? দাঁড়াননি। লেবারদের ন্যায্য পাওনা এখনো মেরে খাচ্ছে। চুরি করে খাচ্ছে। সেটা বলেছেন কখনো?

তিনি বলেন, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইউরোপে কেউ যদি ট্যাক্স ফাঁকি দেয়- সঙ্গে সঙ্গে তাকে অ্যারেস্ট করবে। তার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে বিক্রি করে দেবে। এটাই তাদের নিয়ম। সেটা দেখে না। সমানে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবার তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদায় করতে হচ্ছে। যারা লিখেছেন তারা এ অনুসন্ধানটা করুক।

ওয়ান ইলেভেনে রাজনৈতিক দল চালুর প্রসঙ্গ তুলে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, পলিটিক্যাল পার্টি করতে চেয়েছিল সেটাও লিখেছে। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক দল করতে গেল। ব্যর্থ হলো কেন? সে যদি গ্রামের মানুষগুলোকে এতই দিয়ে থাকে তাহলে মানুষগুলো তো তার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারা আসেনি কেন? কারণ সুদের চাপে তারা মৃতপ্রায় ছিল। সেজন্য তার ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি। সেখানে সে ব্যর্থ হয়েছে। সে দায়িত্বও কী আমার? আমি তো তখন জেলে। তিনি তো কেয়ারটেকার সরকার ও সে সময়ের প্রেসিডেন্টকে ডাবল এ প্লাস দিয়েছেন।

বিদেশে ড. ইউনূসের ব্যবসার মুলধন নিয়ে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আমার প্রশ্ন এই যে বিদেশে বিনিয়োগের এত টাকা কোথা থেকে আসছে। কার টাকা? কীভাবে উপার্জন করেছেন এ টাকা। এটা কাদের টাকা। সে জবাবটা দিক। সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা অবস্থায় বাইরে ব্যবসা করে। আমাদের আইন কী বলে? ওনার পয়সা আছে উনি লেখাচ্ছেন। উনি যদি এতই জনপ্রিয় হন তাহলে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিবৃতি দিতে হবে কেন?