বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোড-প্যারারা রোডের সংযোগ মুখে নিজ বাড়িতে জন্ম থেকে বাস করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত হোসেন চৌধুরী (৭২)। কয়েক বছর ধরে নগরীর কোলঘেঁষে প্রবাহিত কীর্ত্তনখোলা নদীতে পানি বাড়লেই তার বাড়ির আশপাশ প্লাবিত হয়। এনায়েত হোসেন চৌধুরী জানান, ১০-১২ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে তার বাসভবনসহ সংলগ্ন সদর রোড-প্যারারা রোড কীর্ত্তনখোলার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। টানা ১ ঘণ্টা বৃষ্টি হলেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

বরিশাল নগরীর প্রায় সব এলাকার বাসিন্দার অভিজ্ঞতই এখন এনায়েত চৌধুরীর মতো। কীর্ত্তনখোলায় অতিরিক্ত জোয়ার হলেই পানি ড্রেন দিয়ে প্রবেশ করে প্লাবিত হয় নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক। নগরীর নিম্নাঞ্চল হিসেবে পরিচিত কীর্ত্তনখোলার তীরঘেঁষা আমানতগঞ্জ, ভাটিখানা, পলাশপুর ও সাগরদী ধান গবেষণা রোডের জিয়ানগর জনপদ কোমর সমান পানির নিচে তলিয়ে যায়। তবে প্রতিদিন স্বাভাবিক জোয়ারেও এসব এলাকা তলিয়ে যায়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত সপ্তাহে নগরীর ওই এলাকাগুলো দফায় দফায় প্লাবিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কীর্ত্তনখোলার নাব্য হ্রাস, নগরীর খাল ভরাট করে সরু ড্রেন নির্মাণ এবং বিদ্যমান খালগুলোয় পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বারবার প্লাবিত হচ্ছে বরিশাল নগরী। বিশেষ করে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পূর্ণিমা ও অমাবশ্যায় মাসে দুবার নগর প্লাবিত হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

কীর্ত্তনখোলায় পরিমাপের দেখভালের দায়িত্বে থাকা বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী তাজুল ইসলাম বলেন, তারাও ধারণা করছেন কীর্ত্তনখোলার নাব্য হ্রাস পেয়েছে। যে কারণে অস্বাভাবিক জোয়ারে কীর্ত্তনখোলার পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। সাগরে নিম্নচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পায় বলে জানান পাউবোর এ কর্মকর্তা।

পাউবোর গেজ রিডার আবদুর রহমান জানান, স্বাভাবিক জোয়ারেই কীর্ত্তনখোলার পানি বিপত্সীমার লেবেল ছুঁইছুঁই। গত সপ্তাহে পূর্ণিমা ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্ন চাপের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের নদনদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কীর্ত্তনখোলা, মেঘনা ও বিষখালীসহ বেশির ভাগ নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেঘনাঘেঁষা উপজেলা বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের সব চর সম্প্রতি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলা বরগুনা, ভোলা ও পটুয়াখালীতেও একই অবস্থা। নিচু এলাকার বসতবাড়িতে কোমর সমান পানি।

বরিশাল নগরীর আরেক প্রবীণ বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা এসএম ইকবাল বলেন, ১৯৮৮ সালের বন্যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের দুই-তৃতীয়াংশ তলিয়ে গেলেও জেগেছিল বরিশাল নগরী। এখন প্রতিদিন দুবার জোয়ারে এ নগরী তলিয়ে যায়। নদী-খালের শহর বরিশালে এ রকম হবে এটা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না।

মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত হোসেন চৌধুরী বলেন, নগরীর সব ড্রেনের সংযোগ কীর্ত্তনখোলার সঙ্গে। তবে এগুলোর লেভেল ঠিক নেই। যে কারণে কীর্ত্তনখোলার পানি অনায়াসে ড্রেন দিয়ে নগরীর মধ্যে প্রবেশ করছে।

নদী-খাল বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু জানান, বরিশাল নগরীর মধ্যে ২২টি খালের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ কিলোমিটার। পুকুর ছিল প্রায় ২০ হাজার। যার মধ্যে ১০ হাজারের বেশি ভরাট হয়ে গেছে। খাল ভরাট করে সড়ক করা হয়েছে। এখন পাঁচ-ছয়টি খালের অস্তিত্ব আছে। তবে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাওয়ায় ওই খালগুলোয়ও পানি প্রবাহিত হয় না। প্রায় আধাকিলোমিটার প্রশস্ত কীর্ত্তনখোলা নদীও ছোট হয়ে গেছে। যেটুকু আছে তা নিয়মিত খনন করা হয় না। এসব কারণেই এখন অতিরিক্ত জোয়ার ও বৃষ্টিতে বরিশাল নগরী প্লাবিত হচ্ছে। কাজী শিবলু আরো জানান, নগরীর সাতটি খাল খননে পাউবো ৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে সিটি করপোরেশনে ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না।

বরিশাল সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বরাবরই দাবি করে আসছে, নগরীর খাল উদ্ধার, খনন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ৪ বছর আগে মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়েছে। সেটি অনুমোদিত হলেই নগরীর জলাবদ্ধতা দূর হবে। তবে ওই প্রকল্প অনুমোদন হবে বা আদৌ অনুমোদিত হবে কিনা তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না।