২০১০ সালের জুনে ফার্মগেট থেকে তুলে নেয়ার পর আজও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। এরপর ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে গুম রাষ্ট্রীয় দমননীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
চলতি বছরের এপ্রিলে বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা মিরাজ শেখকে (৩০) গুমের অভিযোগ ওঠে। সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন মিরাজ। গত ১০ এপ্রিল মোংলার জয়মণি এলাকা থেকে সাদা পোশাকে কোস্টগার্ডের দুই সদস্য তাকে তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে মিরাজের সন্ধানের দাবিতে আন্দোলন করায় গত জুনে গ্রামবাসীর সঙ্গে কোস্টগার্ডের সংঘর্ষ হয় এবং এ বাহিনীর করা এক মামলায় মিরাজের অসুস্থ মা, স্ত্রী, বোনসহ ১২ জনকে ২৭ দিন কারাবাস করতে হয়।
গত ৩ আগস্ট ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। আর গত ২৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে এ-সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করেন। পরে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন তিনি। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন।
এ বিলে গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তির অন্যূন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এতে গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়নি। এ ধরনের মামলার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাধীন তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত না করে বিল পাস করা হলে গুমের ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহির পথ কঠিন হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হবে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এ দিবসে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গুম হওয়া ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানাই। বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ হচ্ছে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন। বিশেষ করে বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অনেক সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নির্দয়, নির্মম ও নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয়।’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের পতিত, পরাজিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করার জন্য গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল। গুম-অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে আটক রাখার জন্য তৈরি করেছিল গোপন বন্দিশালা। পলাতক ফ্যাসিস্ট আমলের এসব গোপন বন্দিখানা জনপরিসরে “আয়নাঘর” নামে পরিচিতি পেয়েছিল।’
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি গুম কমিশন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে জানায়, মোট ১ হাজার ৯৯৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে যাচাইযোগ্য ১ হাজার ৫৬৯ অভিযোগের মধ্যে ২৮৭ জন গুমের শিকার মানুষ এখনো নিখোঁজ।
২০১৯ সালে মিরপুর থেকে গুম হওয়া বাবা ইসমাইল হোসাইন বাতেনের জন্য সাত বছর ধরে রাজপথে লড়াই করা আনিশা ইসলাম ইনশা বলেন, ‘রÅাবের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের তদন্ত পুলিশ কীভাবে করবে, যেখানে পুলিশ নিজেই একসময় র্যাবের বিরুদ্ধে জিডি নিতে অস্বীকার করত। প্রায় সব ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গেই এটা হয়েছে।’
গুমের শিকার ও বর্তমান সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) বলেন, ‘খসড়া আইনের মাধ্যমে প্রকারান্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুনরায় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের উসকানি দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে। খসড়া আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দিয়েই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করানোর বিধান রাখা হয়েছে, যা গুম প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় আইনি বাধা। এমনকি তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আরো বেশি আতঙ্কিত করে তুলবে।’
সাবেক গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘খসড়া আইনের ধারা ১৪-তে দেয়া আছে যে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে হবে। এরপর যুক্ত করা হয়েছে যে অভিযুক্ত বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না, দরকার হলে অন্য কেউ বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত টিম করবে। যখন কাউকে তুলে নেয়া হয়, তখন পরিবার বড়জোর জানতে পারে সাদা পোশাকে কয়েকজন মানুষ এসে তুলে নিয়ে গেছে। তারা তো অনেক সময় অভিযুক্ত বাহিনীর নামই বলতে পারে না। আর যখন তারা নাম বলবে, ততক্ষণে অভিযুক্তরা অন্য বাহিনীতে চলে গেছে। গুম প্রতিরোধ আইন তখনই সফল হবে যখন তদন্ত সংস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউশন টিমের ডিজিটাল এভিডেন্স স্ট্র্যাটেজিস্ট ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, রায়বাজার গণকবরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার মরদেহের ডিএনএ স্যাম্পলিং করা হলেও এ পর্যন্ত মাত্র ২৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রীয় হয়রানি ও মামলার ভয়ে অনেক পরিবার এখনো ডিএনএ নমুনা দিতে এগিয়ে আসছে না। এ রকম নানা কারণে নিখোঁজ ও নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণেও চরম ধীরগতি দেখা দিয়েছে।










