করোনা মহামারীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি বিবেচনায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে করের বোঝা বাড়ানো হচ্ছে না। বরং করপোরেট করসহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে করহার কমছে। এতে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব কিছুটা কম এলেও বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে বলে মনে করছে সরকার। এদিকে রাজস্ব বাড়াতে সম্পদশালীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে বাড়ানো হচ্ছে সম্পদ কর বা সারচার্জ। ন্যূনতম সারচার্জ বাতিল করে স্ল্যাব পুনর্গঠন করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সরবরাহ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পুঁজিবাজারে নেই এমন প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো হতে পারে। নতুন বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা, কোম্পানি সম্প্রসারণ ও এফডিআই আকর্ষণে করপোরেট করে ছাড় দেয়ার পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের পক্ষ থেকেও করপোরেট কর কমানোর দাবি রয়েছে। ছয় বছর পর চলতি অর্থবছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কর কমানো হয়। আগামী বাজেটে করোনা বিবেচনায় আরো আড়াই শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বর্তমানে করপোরেট কর থেকে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আসে। বিদ্যমান কর কাঠামো অনুযায়ী, করপোরেট করের স্তর রয়েছে আটটি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ২৫ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত কোম্পানি ৩২ দশমিক ৫, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নতুন ব্যাংক ৩৭ দশমিক ৫, তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক ৪০, মার্চেন্ট ব্যাংক ৩৭ দশমিক ৫০, সিগারেট, জর্দা ও গুলসহ তামাকজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারী কোম্পানি ৪৫, তালিকাভুক্ত মোবাইল কোম্পানি ৪০ ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানি ৪৫ এবং লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০ শতাংশ করপোরেট কর দেয়। এর বাইরে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান ১০ ও ১২ শতাংশ এবং সমবায় প্রতিষ্ঠানকে ১৫ শতাংশ হারে করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয়।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দেশে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার টিআইএন বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারধারী কোম্পানি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই রিটার্ন দাখিল করে। গত অর্থবছর এ খাত থেকে রাজস্ব আহরণ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
জানতে চাইলে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট ট্যাক্স অনেক বেশি। তাই করপোরেট ট্যাক্স কমাতে হবে। আগামী বাজেটে কমানোর যে উদ্যোগ এটা অবশ্যই ইতিবাচক। ট্যাক্স কমলে ব্যবসায় কিছুটা গতি আসবে।
সম্পদ কর বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্যান্য ট্যাক্স দেয়ার পর আবার যদি বাড়তি কর দিতে হয় তাহলে মানুষ নিরুৎসাহিত হবে। যিনি কর দিচ্ছেন তার ওপরই আরো কর চাপানো হচ্ছে। আমরা সবসময় বলছি, করহার কমান তবে করের আওতা বাড়ান। কিন্তু এনবিআরের পলিসি হচ্ছে, যিনি দিচ্ছেন তার ওপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে। এখন গ্রামগঞ্জেও মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হয়েছে। বর্তমানে এনবিআরের লোকবলও বেড়েছে। সুতরাং যারা কর দিচ্ছেন তার ওপর আর করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বাড়াতে কাজ করুক এনবিআর, এটাই আমরা চাই।
এছাড়া আমদানি পর্যায়ে আগাম আয়কর (এআইটি) হার কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত আগাম আয়কর দিতে হয়, যা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এ হার কমিয়ে ১ থেকে ৩ শতাংশ করতে পারে এনবিআর। আমদানি পর্যায়ে আগাম কর (এটি) ও ভ্যাট কমতে পারে। কাঁচামাল আমদানিতে বর্তমানে ৪ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এ হার ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়বে।
এদিকে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সম্পদশালীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সম্পদ কর বাড়ানো হচ্ছে। ন্যূনতম সম্পদ কর বাতিল করে স্ল্যাব পুনর্গঠন করা হবে। বর্তমানে এ করের সাতটি স্তর আছে। নিট সম্পদের মূল্যমান ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে সম্পদ কর দিতে হয় না। তবে সম্পদের মূল্যমান ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা হলে বা একাধিক মোটরগাড়ি থাকলে কিংবা যেকোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় আট হাজার বর্গফুটের বেশি গৃহসম্পত্তি থাকলে সে ব্যক্তির আয়করের ওপর ১০ শতাংশ বা ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা সম্পদ কর দিতে হয়। সম্পদের পরিমাণ ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ বা ৪ হাজার টাকা, ১০ থেকে ১৫ কোটি পর্যন্ত ২০ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা, ১৫ থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত ২৫ শতাংশ, ২০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ও ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে সম্পদের দশমিক ১ শতাংশ অথবা আয়করের ৩০ শতাংশের বেশি যেটি হয় সেই হিসাবে সম্পদ কর দিতে হয়।
আগামী বাজেটে সম্পদ কর বা সারচার্জের স্তর পাঁচটিতে নামিয়ে এনে ন্যূনতম সম্পদ কর প্রথা বাতিল করা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের সম্পদ কর দিতে হবে না। ৩ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত ২০ শতাংশ, ২০ থেকে ৫০ কোটি পর্যন্ত ৩০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদশালীদের আয়করের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হবে।
প্রসঙ্গত, সম্পদ কর বা সারচার্জ হচ্ছে এক ধরনের মাশুল, যা ব্যক্তির সম্পদের দলিলমূল্যের ওপর আদায় করা হয়। সর্বপ্রথম ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান শাসনামলে সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) চালু করা হয়। সেটি স্বাধীনতার পরও অব্যাহত ছিল। ১৯৮৮ সালে সরকার স্থায়ীভাবে সম্পদ কর আদায় করতে অর্থ আইনের মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশে ১৬এ ধারা যুক্ত করে। বর্তমানে এ ধারা অনুযায়ী সম্পদ কর আদায় করা হচ্ছে। পরে নানামুখী চাপে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে সেটি প্রত্যাহার করা হয়। তবে ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে পুনরায় সম্পদ কর চালু করা হয়।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, পুঁজিবাজারের তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিগুলোর জন্য যে করহার সেটা অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। এক্ষেত্রে করহার কমানো যেতে পারে। তবে কর কমালেই যে বিনিয়োগ বাড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিনিয়োগের জন্য ব্যবসা সহজীকরণ সূচক, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুতের সহজলভ্যতার বিষয়গুলোতে যে ঘাটতি রয়েছে সেগুলো মেটাতে না পারলে বিনিয়োগ বাড়বে না।
তিনি আরো বলেন, স্বল্প পরিসরে সম্পদ কর বাড়ানোর বিষয়টি চিন্তা করা যেতে পারে। তবে কোন ধরনের সম্পদের ওপর কর বসানো হচ্ছে সেটা দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় ডাবল বা ট্রিপল ট্যাক্সেশন হয়ে যায়। এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে।
আগামী ৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। বাজেটে ব্যয়ের সম্ভাব্য আকার ৬ লাখ ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয় পরিকল্পনা এরই মধ্যে অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ। বাজেটে মোট ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকতে পারে। এর মধ্যে এনবিআরকে সংগ্রহ করতে হবে চলতি অর্থবছরের মতো ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত কর ও কর ব্যতীত সরকারের প্রাপ্তি থেকে রাজস্বের বাকি ৫৯ হাজার কোটি টাকা আসবে। ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।










