সুন্দরবনে ডলফিনের জন্য ঘোষিত অভয়ারণ্যগুলোয় প্রাণীটির বিচরণ বেড়েছে বলে দাবি করছে বন অধিদপ্তর। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অধিদপ্তর জানিয়েছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য রক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্পসহ গৃহীত বেশকিছু উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনের অভয়ারণ্যগুলোয় ডলফিনের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
নোনামিঠা পানিতে বিচরণকারী ডলফিন ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিন শুশুকের অন্যতম বড় আবাসস্থল হলো সুন্দরবনের নদনদী। নানাবিধ কারণে দেশে উভয় প্রজাতির ডলফিনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় আবারো প্রাণপ্রাচুর্য ফিরে এসেছে সুন্দরবনের ডলফিন অভয়াশ্রমগুলোয়। মূলত স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করার কারণেই এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া গিয়েছে বলে অভিমত বন অধিদপ্তরের।
জানা গিয়েছে, ২০১৬ সালে ডলফিন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য রক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি হাতে নেয় বন অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় স্থানীয়দের ডলফিন সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। পাশাপাশি নদীসম্পদের ওপর চাপ কমানোর তাগিদে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের কার্যক্ষমতা ও বিকল্প জীবিকার উপায় বাড়ানোরও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন ও এর ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনে ডলফিনের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিকে দেশে প্রাণীটির সংরক্ষণ কার্যক্রমে একটি মাইলফলক বলা চলে।
প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন খুলনার সাবেক বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মদিনুল আহসান। সম্প্রতি তার কর্মস্থল বদলি হয়েছে। যোগাযোগ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ডলফিন সুন্দর প্রতিবেশের সূচক। দেশে ডলফিন রক্ষার্থে সুন্দরবনের চাঁদপাই, দুধমুখী, ঢাংমারীতে তিনটি অভয়ারণ্য রয়েছে। এসব এলাকায় ডলফিনের অবাধ বিচরণের জন্য আমরা বন বিভাগের কর্মকর্তাদের টহল বাড়িয়েছি। এসব এলাকার জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও করে দেয়া হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে ডলফিন রক্ষায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। মূলত এসব উদ্যোগের ফলেই ডলফিনের সংখ্যা বেড়েছে।
এছাড়া গত ১২ মার্চ সুন্দরবনে নতুন আরো তিনটি অভয়ারণ্যের ঘোষণা দেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। নতুন এ অভয়ারণ্যগুলো হলো ৪০ হেক্টরের পানখালি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ২১ হাজার ১৫৫ হেক্টরের শিবসা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ৮৬৮ হেক্টরের ভদ্রা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এসব উদ্যোগ সুন্দরবনে ডলফিনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে আরো ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশের নদী ও সাগরের জলসীমায় মোট সাত প্রজাতির ডলফিন দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে শুধু নদীতে দেখা যায় দুই প্রজাতির। শুশুক ও ইরাবতী। ইরাবতী ডলফিন মূলত উপকূলের বাসিন্দা। উপকূলে যেসব জায়গায় নোনা ও মিঠা পানির মিশ্রণ পাওয়া যায়, সেখানেই প্রাণীটিকে দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে শুধু নদীকেন্দ্রিক বা শুধু মিঠাপানির ডলফিন বলা চলে একমাত্র শুশুককে।
কয়েক দশক আগেও পৃথিবীতে শুধু মিঠা পানির ডলফিন ছিল পাঁচ প্রজাতির। দক্ষিণ আমেরিকার বোটো ও টুকুক্সি, চীনের বাইজি, সিন্ধুর ভুলান এবং গঙ্গা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণফুলী-সাঙ্গু অববাহিকার গ্যাঞ্জেস রিভার ডলফিন বা শুশুক। নদীর এসব ডলফিনের মধ্যে বাইজিকে এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে শুশুক ও ভুলান। এ দুই প্রজাতির মধ্যে শুশুককে দেখা যায় শুধু বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে। বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে প্রাণীটিকে লাল তালিকাভুক্ত করেছে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (আইইউসিএন)।
অপরিণামদর্শী ও অপরিকল্পিত নদীশাসন, অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ পন্থায় মত্স্য শিকার, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারসহ জেলেদের অজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্টদের সচেতনতার অভাব প্রাণীটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে নিয়ে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর অনেক শুশুক মারা যায় শুধু জেলেদের ভুলে। ডলফিন নিঃশ্বাস নেয় পানির ওপর থেকে। অনেক সময় নদীতে মাছ ধরার জন্য পেতে রাখা জালে পাখা আটকে পড়ে প্রাণীটির। ফলে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য পানির ওপরে উঠতে না পেরে দমবন্ধ হয়ে মারা যায় অনেক শুশুক। জালে প্রাণীটির পাখা আটকানোর পর জেলেদের চোখে পড়লে অনেকে তা ছাড়িয়ে দেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাল বাঁচাতে গিয়ে শুশুকের পাখা কেটে দেন জেলেরা, যে কারণে সাঁতার কাটতে না পেরে ডুবে গিয়ে মৃত্যু ঘটে প্রাণীটির। উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর ইরাবতী ডলফিন প্রতি বছর এভাবে মৃত্যুবরণ করে।










