দেশের সবচেয়ে বেশি গ্রীষ্মকালীন টমেটো উৎপাদন হয় দিনাজপুরে। অধিক লাভের আশায় বাড়তি টাকা খরচ করে এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষীরা। এ জেলায় ব্যাপক হারে গ্রীষ্মকালীন ‘নাবি জাতের’ টমেটোর চাষ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ না থাকায় এবারো টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি, পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা কম থাকায় লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে চাষীদের।

দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার শেখপুরা ইউনিয়নের গর্ভেশ্বরী নদীর তীরঘেঁষে গাবুড়ায় বসছে উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গ্রীষ্মকালীন টমেটোর বাজার। ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলমান এ বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৬০০-৭০০ টন টমেটো বেচাকেনা হয়। ঢাকা, সিলেট, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এসব টমেটো কেনেন ব্যবসায়ীরা।

গাবুড়া বাজার ঘুরে দেখা যায়, নদীতীর থেকে মাস্তান বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার পাকা সড়কের উভয় পাশে এমনকি মানুষের বাড়ির আঙিনায়ও অস্থায়ী আড়তঘর বানানো হয়েছে। সেখানে টমেটো বাছাই করে ক্যারেটে (ঝুড়ি) ভরা হচ্ছে। কেউ ট্রাকে মাল তুলছেন, কেউ চাষীদের কাছ থেকে মাল বুঝে নিচ্ছেন।

দুই বছর ধরে টমেটোর ভালো ফলন দেখেছেন দিনাজপুরের টমেটোচাষীরা। কিন্তু সবুজ গাছে লাল ফল দেখে আনন্দ পেলেও বাজারে বিক্রি শেষে মলিন মুখে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের। চলতি মৌসুমেও টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। এক মাস আগে ৭০০ টাকা মণের টমেটো করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়। লকডাউনে গাড়ি ভাড়া বেশি, অন্যদিকে ক্রেতাও কম এ অজুহাতে টমেটোর দাম কমিয়েছেন ব্যবসায়ীরা—অভিযোগ চাষীদের।

টমেটোচাষী শ্যামচন্দ্র (৫০) বলেন, ‘ছয় বিঘা মাটিত টমেটো লাগাইছিনু। দাম ভালোয় আছোলো, আইজ বাজারত আসিয়া দেখনু দাম পড়ি গেইসে। ২৪ মণ টমেটো বিক্রি করিনু ২৫০ করি। যেইঠেনা হবার কথা আছোলো কমছে কম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। মাহাজান কহেচে টমেটো কিনার লোক নাই, দাম বাড়িবি কেংকরি।’

টমেটো বিক্রি করে বাড়ি ফিরছিলেন চিরিরবন্দর উপজেলার তৈয়ব আলী (৫৫)। তিনি জানান, চলতি বছর এক বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। হাল চাষ, নিড়ানী, সার-কীটনাশকসহ সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৩৯ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ২০০ মণের অধিক টমেটো পাবেন। গত সপ্তাহ পর্যন্ত ৬০০ টাকা মণ হিসেবে ২৮ হাজার ৮০০ টাকার টমেটো বিক্রি করেছেন। কিন্তু আজকে সেই টমেটো ২৩০ টাকা মণে বিক্রি করতে হয়েছে।

কয়েকজন টমেটোচাষী বলেন, ২০১৯ সালে সর্বশেষ টমেটো চাষ করে লাভ পেয়েছেন তারা। সেবার মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ৫৫০-৬০০ টাকা প্রতি মণ টমেটো বিক্রি করেছেন। তারপর থেকে শীতকালীন টমেটো এবং সর্বশেষ গ্রীষ্মকালীন নাবি জাতের টমেটো—সব মৌসুমেই লোকসান। চাষীরা বলছেন, টমেটো দ্রুত পচনশীল পণ্য। একই সময় সবার ফসল ওঠে। সেক্ষেত্রে টমেটো যদি কিছুদিন সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে কৃষকরা লাভবান হবেন। টমেটো চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরো বাড়বে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তৌহিদ ইকবাল বলেন, ২০১৭-১৮ মৌসুমে এ জেলায় টমেটোর চাষ হয়েছে ১ হাজার ১৬৭ হেক্টর জমিতে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে টমেটোর চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষকরা যেভাবে আগ্রহী হয়ে চাষ করছেন, যদি দাম সেভাবে না পান তাহলে ভবিষ্যতে টমেটো চাষ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। তিনি বলেন, টমেটো সংরক্ষণে হিমাগার স্থাপনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া শিল্প ও বণিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, স্থানীয়ভাবে তাদের বিষয়টিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।