বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঝুঁকি কমাতে নিয়োগকারী এজেন্সির কার্যকর গ্রেডিং ব্যবস্থা চালু এবং সাব-এজেন্টদের নিবন্ধন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে অভিবাসনসংক্রান্ত অভিযোগের ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশই নিবন্ধনহীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বলে এক সংলাপে জানানো হয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল হলিডে ইনে উইটনেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘ফেয়ার অ্যান্ড এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট: অ্যাকাউন্টেবল সাব-এজেন্টস’ শীর্ষক সংলাপে এ তথ্য উঠে আসে। সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর।

বক্তারা বলেন, কর্মীরা অর্থ দেয়ার আগে নিয়োগকারী এজেন্সি কিংবা তাদের প্রতিনিধির পরিচয় যাচাই করতে পারছেন না। সাব-এজেন্ট নিবন্ধন ও তদারকির দুর্বলতা এবং এজেন্সির কার্যকর শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা না থাকায় প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ছে।

প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর নিয়োগকারী এজেন্সির গ্রেডিং করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, সাব-এজেন্টদের তথ্য জমা দেয়ার সফটওয়্যার ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ভবিষ্যতে এজেন্সিগুলোকে তাদের প্রতিনিধিদের তালিকা জমা দিতে হবে এবং তা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এতে বিদেশগামী কর্মীরা অর্থ দেয়ার আগে প্রতিনিধির পরিচয় যাচাই করতে পারবেন। অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্যসেবা দিতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে কাজে লাগানোর প্রস্তাবও স্বাগত জানান তিনি।

উইটনেস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী জানান, একজন অভিবাসী কর্মীর নিয়োগে ব্যয় করা অর্থ তুলে আনতে গড়ে প্রায় ১৫ মাস সময় লাগে। উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, অভিবাসনসংক্রান্ত ১ হাজার ৪১৪টি অভিযোগের মধ্যে ৭৮৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা ফেরত পেয়েছেন ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে অনেক কর্মী লেনদেনের রসিদ বা প্রমাণ সংরক্ষণ না করায় মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অভিবাসন বাজারের একক দেশের ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও সংলাপে উঠে আসে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বিদেশে কর্মী পাঠানোর ৭৩ শতাংশই ছিল সৌদি আরবকেন্দ্রিক। বক্তারা বলেন, শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ, চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং বিদেশী নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি।

ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকারী এজেন্সি বড় অঙ্কের টাকা নিলেও রসিদ দেয় না। মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে লেনদেন হলে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী আবুল কালাম বলেন, ২০২০ সালে চালু হওয়া এজেন্সির শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। এজেন্সিগুলোর নিজস্ব বিদেশী প্রতিনিধি না রেখে ভিসা-মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সাব-এজেন্টদের শুধু আইনি স্বীকৃতি দিলেই হবে না, বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৩ সালের আইন সংশোধন ও ২০২৫ সালের বিধিমালার আলোকে নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারীদের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ডিজিটাল ব্যবস্থায় তদারকি জোরদারের প্রস্তাব দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার রেহনুমা সালাম খান বলেন, বিদেশে কত কর্মী গেল, শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে অভিবাসন খাতের সাফল্য পরিমাপ করা উচিত নয়। কর্মীদের দক্ষতা, কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং অভিযোগ কমানোর অগ্রগতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম সচিব ফখরুল ইসলাম নিয়োগের তথ্য অনলাইনে সংরক্ষণ, ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারী এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব দেন।

বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত পথে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সংলাপে নিয়োগকারী এজেন্সির গ্রেডিং ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা, সাব-এজেন্টদের নিবন্ধন ও প্রতিনিধিদের তালিকা প্রকাশ, ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্যসেবা সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়া বা দ্রুত দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পরিস্থিতি পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।