শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চল ময়মনসিংহের ভালুকার অন্যতম বড় কারখানা বস্ত্র খাতের এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল লিমিটেড। গ্যাস সংকটে ছয় মাস ধরে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখতে পারছে না কারখানাটি। গত তিন মাসে এ সমস্যা আরো বেড়েছে। বর্তমানে সন্ধ্যা ৬টার পর কারখানায় গ্যাসের চাপ একেবারেই শূন্যে নেমে আসছে। ৬ ডিসেম্বর এ সমস্যার তথ্য জানিয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছেন কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সেখানে বলা হয়েছে, গ্যাসের সমস্যা এমন পর্যায়ে এসেছে যে কারখানা লে-অফ (সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকার দরুন শ্রমিকদের কর্ম অব্যাহতি) ছাড়া আর কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। সেক্ষেত্রে বিপাকে পড়তে পারেন কারখানার ছয় হাজার কর্মী।
শুধু এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল নয়, ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলার অনেক কারখানায় এখন গ্যাসের সংকট মারাত্মক আকার। এর মধ্যে তিতাসের ভালুকা স্টেশনের অধীনে গ্যাসের গ্রাহক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে ৫৭টি। কারখানাগুলোর প্রতিটিতেই গ্যাসের চাপ শূন্য হওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের সমস্যা এখন অনেক বেশি। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা গ্যাস থাকছে না কারখানায়। রাতে গ্যাসের চাপ শূন্য। আমরা তিতাস কর্তৃপক্ষকে সমস্যার কথা জানিয়েছি। তারা আমাদের বলেছে যে ২৪ ঘণ্টার পুরোটা সময় গ্যাস পাওয়া যাবে না, মাত্র ১২ ঘণ্টা পাওয়া যাবে। বয়লার চালুর পর নির্ধারিত তাপে নিয়ে আসতে ১২ ঘণ্টা উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। এ প্রক্রিয়ায় ১০ ঘণ্টা কারখানায় উৎপাদনের সময় পাওয়া যায়। আবার দিনের বেলায় গ্যাস সবসময় নিরবচ্ছিন্নও থাকে না। সব মিলিয়ে কারখানার উৎপাদন বন্ধ করার উপক্রম হয়েছে।’
ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলায় গ্যাস সংকটে ভুক্তভোগী শিল্প-কারখানাগুলোর অন্যতম আকিজ সিরামিকস লিমিটেড। ত্রিশালে অবস্থিত আকিজ সিরামিকস লিমিটেডের কারখানায় টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও টেবিলওয়্যার উৎপাদন হয়। বিনিয়োগ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। ত্রিশালে আকিজের টাইলস উৎপাদনে নিয়োজিত ইউনিট রয়েছে চারটি। কারখানাগুলোর দৈনিক টাইলস উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ লাখ বর্গফুট। দেশের চাহিদার ২০ শতাংশই পূরণ করে ইউনিটগুলো। বর্তমান জ্বালানি সংকটের কারণে ইউনিটগুলো উৎপাদন নিয়ে বিপদে রয়েছে।
সম্প্রতি তিতাসের এমডি বরাবর আকিজ সিরামিকস থেকেও গ্যাস সংকটে কারখানা লে-অফের আশঙ্কার কথা জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির একটি অনুলিপি তিতাস সূত্রে বণিক বার্তার হাতে এসেছে। আকিজ সিরামিকসের পক্ষ থেকে চিঠির অনুলিপি ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার, জেলা ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কার্যালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান, ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, কারখানাটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের। নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন করতে না পারায় গত এক বছরে কারখানাটিতে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ ব্যাংকঋণের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে এখন বাধ্য হয়েই গ্যাসের চাপ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত কারখানা লে-অফ ঘোষণার বিষয়ে ভাবতে হচ্ছে।
ভালুকা-ত্রিশালের অন্য অনেক শিল্পোদ্যোক্তাও গ্যাস সংকটে কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন। আকিজ সিরামিকস লিমিটেড ছাড়াও বিডায় চিঠি পাঠানো কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে দবিরুদ্দিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড, মুলতাজিম স্পিনিং মিলস লিমিটেড, তাফরিদ কটন মিলস লিমিটেড, শীমা কটন মিলস লিমিটেড ও বাশার স্পিনিং মিলস লিমিটেড।
বস্ত্র ও সিরামিক টাইলসের বাইরে ভালুকা-ত্রিশাল অঞ্চলে স্যানিটারিওয়্যার, টেবিলওয়্যার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও পশুখাদ্য উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে বেশ কয়েকটি। এসব কারখানায় কর্মরত ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক। সব মিলিয়ে দুই উপজেলায় স্থাপিত কারখানাগুলোয় ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ রয়েছে বলে স্থানীয় খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গ্যাসের চাপশূন্যতার বিষয়টি অস্বীকার করছেন না তিতাসের কর্মকর্তারাও। ভালুকায় তিতাসের কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ নিয়ে সংকট আছে। ভালুকায় এ সমস্যা বেশি। গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য। গ্যাসের চাপ যে এ পর্যায়ে নামবে সেটি আগেই ঘোষণা করা আছে। এখানকার সব কারখানাকেই এ সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে এখন কারখানায় গ্যাস দেয়া যাচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের কারখানাগুলোকে নানা মাত্রায় গ্যাস সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী কারখানা-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্যমতে, গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়িকভাবেও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
গ্লোরি স্পিনিং মিল নামে বস্ত্র খাতের একটি কারখানার জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন) সোহেল রানা জানান, অনেক সময় বিকাল থেকেই গ্যাসের চাপ কমে যায়। সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যায়। আবার সকালে গ্যাসের চাপ বাড়ে।
বিএসবি স্পিনিং মিল নামে আরেক কারখনার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সেলিম আল রাজি জানান, সন্ধ্যার পর থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গ্যাসের কোনো চাপ থাকে না। সেজন্য জেনারেটর চালানো সম্ভব হয় না। জেনারেটর না চললে উৎপাদন বন্ধ থাকে। মাঝে মাঝে দিনের বেলায় প্রেসার কম থাকে।
শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ৪ ডিসেম্বর থেকে হঠাৎ করে বিনা নোটিসে সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত প্রতিদিন গ্যাস সরবরাহ একদমই শূন্যে নেমে আসছে। এতে উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিয়োজিত জেনারেটর বন্ধ হয়ে পুরো কারখানা ও সংলগ্ন আবাসিক এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক খরচ এখন ব্যাংকঋণের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণের মাধ্যমে চালানো সম্ভব নয়। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের লে-অফের কথা ভাবতে হচ্ছে।
শেফার্ড গ্রুপের জিএম মোকলেছুর রহমান জানান, মিলটি শতভাগ রফতানিমুখী। বর্তমান সংকটের কারণে এ মিলের উৎপাদন অর্ধেকে কমে গেছে। বিদেশী মিল মালিকরা ভর্তুকির মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন দিয়ে মিল চালাচ্ছেন।
সিরামিক শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য কারখানায় ব্যবহূত চুল্লিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্দিষ্ট উচ্চতাপমাত্রা ধরে রাখতে হয়, যার জন্য গ্যাসের নির্দিষ্ট চাপের প্রয়োজন হয়। একবার বন্ধ হলে চুল্লিতে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা তুলতে সময় লাগে দুদিনের বেশি। কিন্তু প্রতিদিন গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে আসায় কারখানাগুলোয় উৎপাদন এখন এক প্রকার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রক্রিয়াধীন অনেক সিরামিক পণ্য।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধির সরজমিন তথ্যানুসন্ধানেও দেখা গেছে, ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলায় গ্যাস সরবরাহ না পেয়ে অনেক কারখানায় উৎপাদন এখন বন্ধ। এ দুই উপজেলায় ছোটবড় দুই শতাধিক শিল্প-কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র খাতের প্রায় ৩৫টি ডায়িং কারখানা রয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ডায়িং ছাড়াও বস্ত্র ও পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট অন্যান্য কারখানাকেও একই বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। গ্লোরি স্পিনিং মিল, বিএসবি স্পিনিং মিল, কনজিউমার নিটেক্স লি. ও শেফার্ড ইয়ার্ন ডায়িংসহ অনেক কারখানায় দিনের বেলা গ্যাসের লাইন চালু থাকলেও প্রেসার কম থাকায় ঠিকমতো উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না মিল কর্তৃপক্ষ। আগে গ্যাসের চাপ কম থাকলে বিকল্প বিদ্যুৎ বা ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে কোনো কোনো কারখানা উৎপাদন চালু রাখতে পারত। কিন্তু এখন ডিজেলসহ সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে।
জানতে চাইলে বস্ত্র খাতের মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গ্যাসের সমস্যা এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। হতাশ কারখানা মালিকরা এখন সমস্যার বিষয়গুলো পুরোটা জানাচ্ছেন না। গত এক-দেড় মাসে কিছুটা উন্নতি হয়েছে শীতকাল চলে আসায়। ভালুকায় কিছু সমস্যা আছে একটা লাইনে। ওখানে কারিগরি সমস্যা হতে পারে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশীদ মোল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটা এলাকায় আমরা রাতের বেলা সরবরাহ বন্ধ করে দিই। সেজন্য চাপ শূন্য থাকে। ভালুকার কিছু এলাকায় এ সমস্যা হচ্ছে, অন্য জায়গায় নয়। রাতের বেলা আরপিসিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দেয়া হয়। সেজন্য বন্ধ রাখতে হয়। সরকারের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী এটা হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তারা এটা জানেন। ৪ তারিখ থেকে এটা হয়েছে। তবে সহনীয় হয়ে যাবে। জানুয়ারিতে কিছু গ্যাস আসতে পারে। এলএনজি এলেই পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। গ্যাস যদি আমার কাছে কম আসে, আমার কিছু করার থাকে না। পেট্রোবাংলা আমাদের যতটুকু গ্যাস দেয়, সেটা আমরা সরবরাহ করি। পেট্রোবাংলা গ্যাস বাড়িয়ে দিলে শিল্প-কারখানা ভালো গ্যাস পাবে।’










