বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের চাহিদা মেটাতে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য ভর্তুকি বাবদ ২ হাজার ৮১২ কোটি টাকা চেয়েছিল পেট্রোবাংলা। তবে সরকারি এ সংস্থার অনুকূলে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আপাতত ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অর্থ বিভাগ ছাড় করেছে। তবে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে আবার তারা টাকা দেবে। করোনার কারণে রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, তাই একেবারে সব টাকা দিতে পারেনি। সুতরাং এলএনজি আমদানিতেও কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সীমিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে গ্যাসের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এ চাহিদা মেটাতে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করছে সরকার। গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী আমদানিনির্ভর এ পণ্যের দাম। এতে এলএনজি আমদানিতে ব্যয়ও বাড়ছে।

চলতি অর্থবছর দেশে এলএনজিবাহী ৭৬টি কার্গো আমদানি করা হবে। এরই মধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে ৩৫টি কার্গো। এখনো ৪১টি কার্গো আমদানির অপেক্ষায়। এসব কার্গো আমদানি ব্যয়, রি-গ্যাসিফিকেশন ব্যয়, ভ্যাট, এআইটি ও পোর্ট চার্জসহ মোট ১৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা খরচ হবে। এছাড়া এলএনজি সরবরাহ করতে টার্মিনালের অপারেশন চার্জ বাবদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে আরো ১৪০ কোটি টাকা দিতে হবে। সব মিলিয়ে চলতি বছর এলএনজি আমদানিতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে উচ্চমূল্যে আমদানীকৃত এলএনজি বিক্রি বাবদ আয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ব্যয়ের বিপরীতে ঘাটতি থাকবে ২ হাজার ৮১২ কোটি টাকা। দেশে কম মূল্যে এলএনজি বিক্রিতে এ অর্থ পেট্রোবাংলার অনুকূলে ভর্তুকি হিসেবে চেয়ে অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করেছে জ্বালানি বিভাগ। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অর্থ বিভাগ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ছাড় করে।

অর্থ বিভাগের বরাদ্দপত্রে বলা হয়, সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে অর্থ বিভাগের বাজেটের অধীন ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার আওতায় এলএনজি আমদানির মূল্য পরিশোধ বাবদ পেট্রোবাংলার অনুকূলে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলো। এক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ থেকে পাঁচটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে এলএনজি আমদানির মূল্য পরিশোধ বাবদ পেট্রোবাংলার অনুকূলে ভর্তুকি হিসেবে প্রদানকৃত অর্থের অডিট রিপোর্ট অর্থ বিভাগে প্রেরণ করতে হবে।

এছাড়া এ অর্থ এলএনজি আমদানির মূল্য পরিশোধ ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যয় করা যাবে না। এ অর্থ দিয়ে বিল পরিশোধের বিবরণী পরবর্তী সময়ে অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে। এ অর্থ ভবিষ্যতে অডিটের মাধ্যমে নিরূপিত মোট প্রদেয় অর্থের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং এলএনজি খাতে ভর্তুকি প্রদানের বিষয়ে সরকারের নীতিগত অনুমোদন গ্রহণপূর্বক প্রশাসনিক বিভাগকে একটি ভর্তুকি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আদেশ অনুযায়ী চলতি অর্থবছর গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি আমদানিসহ গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯ কোটি ঘনমিটার। প্রতি ঘনমিটারে ৫ টাকা ৪৮ পয়সা আয়ের পরও আমদানি ব্যয় মেটাতে ২ টাকা ২১ পয়সা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। সে হিসাবে মোট সরবরাহকৃত গ্যাসে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা।

২০১৯-২০ অর্থবছর এলএনজি আমদানিতে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল। তবে চলতি অর্থবছর ভর্তুকির পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। ভর্তুকির বিষয়ে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলেন, প্রতি অর্থবছর গ্যাস খাতে যে পরিমাণ ভর্তুকি চাওয়া হয় তার অর্ধেক অর্থ মেলে। ফলে ভর্তুকির দায় টেনে বেড়াতে হয় পেট্রোবাংলাকে। এবার এলএনজির বাজার অস্থির। এবার যে কী হবে বলা মুশকিল।

দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ায় ২০১৮-১৯ অর্থবছর প্রথমবারের মতো এ খাতে ১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয় সরকার। কিন্তু ওই অর্থবছর ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দেয় পেট্রোবাংলা। পরের অর্থবছর এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি দেয় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।